বাইরে থেকে দেখলে সাধারণ একটি গ্রামীণ বাড়ি। কিন্তু ভেতরে পা রাখতেই মনে হবে যেন প্রকৃতির রঙে আঁকা এক জীবন্ত ক্যানভাস। কোথাও নানা রঙের ফুলের সমারোহ, কোথাও দেশি-বিদেশি ফলের গাছের সারি। একপাশে সবজির সবুজ ক্ষেত, অন্যপাশে পশুপাখির কলতান। চারদিকে প্রাণের স্পন্দন। আর এই স্বপ্নময় জগতের নির্মাতা মুজাহিদুর রহমান টুটুল ও তার স্ত্রী পারভীনা আক্তার।
মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার বাঁশবাড়িয়া গ্রামের মৃত মজিবুর রহমানের পুত্র মুজাহিদুর রহমান টুটুল। একসময় ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। উচ্চশিক্ষা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করলেও চাকরির চাপ আর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মানসিক নির্যাতন তাকে ক্রমেই ক্লান্ত করে তুলেছিল। একপর্যায়ে তিনি উপলব্ধি করেন, এই জীবন তার জন্য নয়। চাকরির নিশ্চয়তা ছেড়ে ফিরে আসেন বাঁশবাড়িয়ায়, গ্রামের মাটিতে। সঙ্গে ছিল একটা স্বপ্ন। নিজের জন্য কিছু করা, আর তরুণদের দেখিয়ে দেওয়া যে সাফল্যের পথ শুধু চাকরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
সেই স্বপ্নের বীজ আজ চার বিঘা জমি জুড়ে বিস্তৃত এক অনন্য খামারে পরিণত হয়েছে। বসতবাড়ির প্রতিটি কোণ যেন তার শ্রম, ভালোবাসা আর ধৈর্যের গল্প বলছে।
খামারের ফলবাগানে রয়েছে বল সুন্দরী, ভারত সুন্দরী ও টক কুল, বেল, কদবেল, লাল ও সবুজ শরিফা, কামরাঙা, মাল্টা, কমলা, বাতাবি লেবু, কাগজি লেবু, লিচু, তেঁতুল, মিষ্টি তেঁতুল, জামরুল, জাম্বুরা ও আমড়াসহ অসংখ্য ফলের গাছ। বিশেষ আকর্ষণ ১৮ জাতের আম। মিয়াজাকি, হাড়িভাঙ্গা, ব্যানানা ম্যাংগো, কাটিমন, বারি-৪, বারি-১১, বারি-১৩, হিমসাগর, বোম্বাই, ল্যাংড়া ও ফজলির মতো দেশি-বিদেশি জাতের আমে ভরে উঠেছে বাগান।
ফুলের বাগানটিও বাহারি গাছে সমৃদ্ধ। নানা রঙের আলামান্ডা, বিদেশি মাদার, রঙ্গন, গোলাপ, জবা, রজনিগন্ধা, সন্ধ্যামালতী, বাগানবিলাস ও পাতাবাহারের রঙিন উপস্থিতি পুরো পরিবেশকে করে তুলেছে মনোমুগ্ধকর।
আরেক পাশে সবজি ক্ষেত। পেঁয়াজ, রসুন, আলু, মরিচ, মাদ্রাজি ওল, কচু ও টমেটোসহ বিভিন্ন সবজির আবাদ। পাশাপাশি রয়েছে গরু, ছাগল, রাজহাঁস, পাতিহাঁস, চিনা হাঁস, দেশি মুরগি, কবুতর ও কোয়েল পাখির খামার। এই খামার যেন একটি পরিপূর্ণ কৃষি পরিবারের প্রতিচ্ছবি।
টুটুল ও পারভীনা দম্পতির দুই সন্তান উচ্ছ্বাস ও উল্লাস। তাদের নামেই খামারের নামকরণ। সন্তানদের ভবিষ্যতের মতোই খামারটিকেও তারা সযত্নে লালন করছেন।
বাঁশবাড়িয়া গ্রামের মধু মণ্ডল বলেন, আগে বাড়ির ফাঁকা জায়গা পড়ে থাকত। টুটুল ভাইয়ের খামার দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে এখন আমি বাড়ির আঙিনায় বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করছি। এতে পরিবারের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি কিছু সবজি বিক্রি করতে পারছি।
একই গ্রামের বাসিন্দা রহিমা খাতুন বলেন, টুটুল ভাইয়ের বাগান দেখতে গিয়েই আগ্রহ তৈরি হয়। পরে তার পরামর্শে বাড়ির পাশে মরিচ, বেগুন, টমেটো ও লাউ চাষ শুরু করি। এখন বাজার থেকে অনেক কম সবজি কিনতে হয়।
মুজাহিদুর রহমান টুটুল বলেন, যেখানেই নতুন কোনো ফল বা ফুলের সন্ধান পাই, সেখান থেকেই সংগ্রহ করার চেষ্টা করি। এখন দুধ, ডিম, মাছ, মাংসের পাশাপাশি প্রায় সব ধরনের সবজি নিজেদের খামার থেকেই পাওয়া যায়। পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত পণ্য বাজারেও বিক্রি করি।
পারভীনা আক্তার বলেন, গাছপালা আর পশুপাখির যত্ন নিতে নিতে কখন যে দিন শেষ হয়ে যায়, বুঝতেই পারি না। প্রতিদিন অনেক মানুষ খামার দেখতে আসেন। তাদের আগ্রহ আমাদের আরও উৎসাহ দেয়।
স্থানীয়দের কাছে টুটুলের খামার এখন শুধু একটি কৃষি উদ্যোগ নয়, বরং সাহসী সিদ্ধান্ত আর আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। চাকরির নিরাপদ গণ্ডি ছেড়ে যে মানুষটি গ্রামের মাটিতে ফিরে এসেছিলেন, তিনি আজ ফল, ফুল, সবজি আর পশুপাখির সমন্বয়ে গড়ে তুলেছেন এক স্বপ্নভূমি। তার গল্প যেন বলে, ইচ্ছাশক্তি আর পরিশ্রম থাকলে মাটিও একদিন সোনার ফসল হয়ে ফিরে আসে।
টুটুলের উদ্যোগ শুধু তার পরিবারকেই স্বনির্ভর করেনি। উদ্বুদ্ধ করেছে আশপাশের মানুষকে। তার খামার দেখে গ্রামের অনেকেই বাড়ির আঙিনায় ফল ও সবজির চাষ করছেন। স্থানীয়দের কাছে টুটুলের খামার এখন একটি অনানুষ্ঠানিক কৃষি শিক্ষা কেন্দ্রের মতো। যেখানে প্রতিদিনই আসছেন নতুন নতুন আগ্রহী মানুষ।
মন্তব্য করুন