জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, শিক্ষায় বাজেট কমানো এবং সরকারের সামরিক ব্যয় বাড়ানোর নীতির প্রতিবাদে ইতালিজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) রাজধানী রোমসহ দেশটির বিভিন্ন শহরের রাজপথে নেমেছেন হাজার হাজার শিক্ষার্থী, শ্রমিক, শিক্ষক ও সাধারণ মানুষ। বিক্ষোভকারীদের কণ্ঠে উচ্চারিত হচ্ছে ‘বোমা নয়, ঘর চাই’ স্লোগান। তাঁদের দাবি, যুদ্ধের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরিবর্তে নাগরিকদের আবাসন, শিক্ষা ও জীবনমান উন্নয়নে আরও বেশি বিনিয়োগ করতে হবে।
ইতালির শ্রমিক সংগঠন ইউনিওনে সিনদাকালে দি বেসে (ইউএসবি) ঘোষিত দেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘটকে কেন্দ্র করে এই বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়। এতে শিক্ষার্থী ও শ্রমজীবী মানুষের পাশাপাশি ট্রাকচালক, ট্যাক্সিচালক, কৃষক এবং অবসরপ্রাপ্ত নাগরিকেরাও অংশ নেন।
রোম, মিলান, বোলোনিয়া, জেনোয়া, নেপলস ও তুরিনসহ কয়েক ডজন শহরে বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। সম্ভাব্য সংঘর্ষ এড়াতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন করা হয়।
রাজধানী রোমে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী কেন্দ্রীয় টারমিনি রেলস্টেশন থেকে মিছিল শুরু করেন। দুটি ট্রাক্টর ও একটি ট্যাক্সিও মিছিলে অংশ নেয়। বিক্ষোভকারীরা ঐতিহাসিক কলোসিয়ামের পাশ দিয়ে অগ্রসর হয়ে বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করেন। এ সময় তাঁদের হাতে ছিল নানা দাবিসংবলিত ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড।
মিছিলের একটি অংশ থেকে ‘আমাদের আরও ঘরবাড়ি দরকার, বোমা নয়’ স্লোগান দেওয়া হয়। যুদ্ধ ও সামরিক খাতে ব্যয় বৃদ্ধির বিরোধিতা করে অংশগ্রহণকারীরা বলেন, আবাসন সংকট এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি মানুষের জীবনকে ক্রমেই কঠিন করে তুলছে। অথচ সরকার সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদার চেয়ে সামরিক খাতকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বলে তাঁদের অভিযোগ।
বিক্ষোভে ফিলিস্তিনের পতাকাও দেখা যায়। গাজায় বোমা হামলার শিকার সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ তুলে ধরতে একদল আন্দোলনকারী প্রতীকী পরিবেশনায় অংশ নেন। এতে যুদ্ধবিরোধী বার্তার পাশাপাশি মানবিক সংকটের বিষয়টিও সামনে আসে।
বাসাভাড়া ও শিক্ষার খরচে বিপর্যস্ত শিক্ষার্থীরা
ইতালির তরুণ প্রজন্মের কাছে উচ্চশিক্ষার ব্যয় ও বাসাভাড়া বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে বড় শহরগুলোতে শিক্ষার্থীদের জন্য সাশ্রয়ী আবাসনের অভাব তীব্র আকার ধারণ করেছে।
রোমের ২১ বছর বয়সী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী বিয়াত্রিচে কিলেল্লি জানান, শিক্ষার্থীরা এখন চরম চাপের মধ্যে রয়েছেন। উচ্চ টিউশন ফি এবং বাসাভাড়ার কারণে অনেক পরিবারের পক্ষে সন্তানদের পড়াশোনার খরচ বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রোমে শিক্ষার্থীদের থাকার জন্য একটি কক্ষের মাসিক ভাড়া কখনো কখনো ১ হাজার ২০০ ইউরো পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ফলে শিক্ষার পাশাপাশি আবাসনের খরচও শিক্ষার্থী ও তাঁদের পরিবারের জন্য বড় ধরনের আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত না করে সরকার সামরিক খাতে ব্যয় বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। এতে তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের অন্যতম সংগঠন ওএসএর মুখপাত্র ১৮ বছর বয়সী লাউরা তেরেসি বলেন, প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকারের পুনরায় অস্ত্রসজ্জা ও সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির নীতির বিরুদ্ধে তাঁরা রাজপথে নেমেছেন। একই সঙ্গে পরিবার, শ্রমিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ এবং শিক্ষা খাতে ধারাবাহিক বাজেট কাটছাঁটের প্রতিবাদ করছেন তাঁরা।
মিলান ও তুরিনে উত্তেজনা, সতর্ক অবস্থানে পুলিশ
রাজধানীর পাশাপাশি মিলানেও শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে বড় বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। কেন্দ্রীয় রেলস্টেশন এলাকা থেকে শুরু হওয়া মিছিল শহরের বাইরের দিকে অগ্রসর হয়।
সেখানে শিক্ষার্থীদের একটি ব্যানারে নিজেদের ভবিষ্যৎ ফিরে পাওয়ার দাবি তুলে ধরা হয়।
এর আগে ১৭ ও ১৮ অক্টোবর মিলানে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে আয়োজিত আন্দোলনের সময় সহিংসতার ঘটনা ঘটে। কিছু বিক্ষোভকারী দোকানপাটে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়।
সেই অভিজ্ঞতার কারণে শুক্রবারের কর্মসূচি ঘিরে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়। বিভিন্ন স্থানে দাঙ্গা পুলিশের উপস্থিতি দেখা যায়। তুরিনে বিক্ষোভের শুরুতে পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে ছোটখাটো সংঘর্ষ হলেও দুপুর পর্যন্ত বড় ধরনের সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি।
মেলোনি সরকারের ওপর বাড়ছে চাপ
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী সরকার সাম্প্রতিক বিক্ষোভ ও সহিংসতার ঘটনার পর জনসমাবেশসংক্রান্ত আইন আরও কঠোর করেছে। একই সঙ্গে অপ্রাপ্তবয়স্কদের আটকসংক্রান্ত নিয়মেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।
অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে ক্ষতিগ্রস্ত ট্রাকচালক, কৃষক ও মৎস্যজীবীদের সহায়তায় সম্প্রতি ১৭ কোটি ৫২ লাখ ইউরোর একটি আর্থিক প্যাকেজ অনুমোদন করেছে ইতালি সরকার।
পাশাপাশি ২০২৭ সালের প্রস্তাবিত বাজেটে তরুণ ও পরিবারগুলোর জন্য নতুন সহায়তামূলক কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ৩০ বছরের কম বয়সী কর্মীদের জন্য বছরে ২ হাজার ৫০০ ইউরো পর্যন্ত বোনাস দেওয়ার একটি প্রস্তাবও রয়েছে।
গত বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী মেলোনি আশা প্রকাশ করেন, সরকারের পরিকল্পিত উদ্যোগগুলো সেই তরুণদের সমস্যা সমাধানে সহায়ক হবে, যাঁরা মনে করছেন রাষ্ট্র তাঁদের প্রয়োজনের প্রতি যথেষ্ট মনোযোগ দিচ্ছে না।
তবে একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন, সরকারি সহায়তা সহিংসতা ও ভাঙচুরে জড়িত ব্যক্তিদের জন্য নয়।
ইউরোপজুড়ে বাড়ছে অসন্তোষ
ইতালির চলমান এই বিক্ষোভের পেছনে শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতিই নয়, ইউরোপের অন্যান্য দেশের সাম্প্রতিক আন্দোলনের প্রভাবও রয়েছে।
ফ্রান্স ও স্পেনের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ইতালির বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কয়েক সপ্তাহ ধরে বিক্ষোভ, অবস্থান কর্মসূচি ও অস্থায়ী তাঁবু স্থাপন করা হয়েছে।
আন্দোলনকারীদের দাবি, মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি বাড়ছে বাসাভাড়া, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। এতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের জীবনযাপন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে ইতালির এই আন্দোলন কেবল দ্রব্যমূল্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ নয়; বরং শিক্ষা, আবাসন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের অগ্রাধিকার নিয়ে সরকারের প্রতি জনগণের অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ।
সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তার ঘোষণা এলেও আন্দোলনকারীরা তাঁদের দাবিতে অনড় রয়েছেন। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় ও সামরিক ব্যয় নিয়ে ইতালিতে চলমান অসন্তোষ আগামী দিনগুলোতে কোন দিকে মোড় নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
মন্তব্য করুন