জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল মাত্র ২৪২ রান। হাতে ছিল পুরো ৫০ ওভার। নিজেদের মাঠে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এই লক্ষ্য তাড়া করাটা পাকিস্তানের জন্য খুব একটা কঠিন হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু সহজ ম্যাচকে অবিশ্বাস্যভাবে কঠিন করে তুললেন পাকিস্তানের ব্যাটসম্যানরা। একের পর এক উইকেট হারিয়ে নিশ্চিত পরাজয়ের মুখে পড়া দলটিকে শেষ পর্যন্ত রূপকথার মতো জয় এনে দিলেন শাদাব খান ও হারিস রউফ। ইংল্যান্ডকে মাত্র এক উইকেটে হারিয়ে ওয়ানডে ত্রিদেশীয় সিরিজে টানা তৃতীয় জয় তুলে নিয়েছে পাকিস্তান।
রোববার (২৫ অক্টোবর) লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচে প্রথমে ব্যাট করে ৪৬ দশমিক ৪ ওভারে ২৪১ রানে অলআউট হয় ইংল্যান্ড। জবাবে ৪৭ দশমিক ১ ওভারে ৯ উইকেট হারিয়ে ২৪৩ রান তুলে জয় নিশ্চিত করে পাকিস্তান। ১৭ বল হাতে থাকলেও জয়ের জন্য শেষ উইকেট পর্যন্ত লড়াই করতে হয়েছে স্বাগতিকদের।
টস জিতে ইংল্যান্ডকে ব্যাটিংয়ে পাঠিয়ে দুর্দান্ত শুরু করেছিল পাকিস্তান। অধিনায়ক শাহিন শাহ আফ্রিদির বিধ্বংসী বোলিংয়ে মাত্র ১৯ রানেই তিন উইকেট হারায় ইংল্যান্ড। তবে বিপর্যয়ের মধ্যেও এক প্রান্ত আগলে রেখে দুর্দান্ত শতক হাঁকান বেন ডাকেট। ১১১ বলে ১০৫ রানের ইনিংস খেলে দলকে লড়াই করার মতো সংগ্রহ এনে দেন তিনি। স্যাম কারান করেন ৪২ রান এবং গাস অ্যাটকিনসনের ব্যাট থেকে আসে অপরাজিত ৩৬ রান।
পাকিস্তানের হয়ে শাহিন শাহ আফ্রিদি ৪৬ রানে চার উইকেট নেন। আরাফাত মিনহাস ও অভিষিক্ত রাজাউল্লাহ দুটি করে উইকেট শিকার করেন।
২৪২ রানের লক্ষ্য নিয়ে ব্যাটিংয়ে নেমেই বিপর্যয়ে পড়ে পাকিস্তান। ফখর জামান, সাইম আইয়ুব ও বাবর আজম দ্রুত সাজঘরে ফেরেন। ফখর ও বাবর ১০ রান করে এবং সাইম মাত্র ৬ রান করেন। তরুণ সাদ বেগ ৩২ রানের আক্রমণাত্মক ইনিংস খেললেও পাকিস্তানের ব্যাটিং বিপর্যয় ঠেকানো যায়নি।
মিডল অর্ডারেও ব্যর্থতার চিত্র ছিল স্পষ্ট। ইংল্যান্ডের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের সামনে পাকিস্তানের ব্যাটসম্যানরা নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকেন। একপর্যায়ে মাত্র ১৫৪ রানে ৯ উইকেট হারিয়ে কার্যত পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায় স্বাগতিকরা।
তখনো জয়ের জন্য প্রয়োজন ৮৮ রান, অথচ হাতে মাত্র একটি উইকেট। এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের জয় প্রায় অসম্ভব বলেই মনে হচ্ছিল। কিন্তু শাদাব খান যেন অন্য কিছু ভেবে রেখেছিলেন।
শেষ ব্যাটসম্যান হারিস রউফকে সঙ্গে নিয়ে অসাধারণ প্রতিরোধ গড়ে তোলেন শাদাব। একদিকে রউফ উইকেট আগলে রাখেন, অন্যদিকে ইংল্যান্ডের বোলারদের ওপর পাল্টা আক্রমণ চালাতে থাকেন শাদাব। চার-ছক্কার মারে ক্রমেই কমিয়ে আনেন রানের ব্যবধান।
ম্যাচের সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্তটি আসে ৪৫তম ওভারে। গাস অ্যাটকিনসনের বলে শাদাবকে এলবিডব্লিউ আউট দেন আম্পায়ার। ইংল্যান্ডের ক্রিকেটাররা জয়ের উদযাপনও শুরু করে দিয়েছিলেন। কিন্তু রিভিউতে দেখা যায়, বলটি ব্যাটের ভেতরের কানায় লেগেছিল। সিদ্ধান্ত বদলে শাদাবকে নটআউট ঘোষণা করা হলে নতুন জীবন পায় পাকিস্তান।
সেই সুযোগ আর হাতছাড়া করেননি শাদাব। তুলে নেন নিজের প্রথম ওয়ানডে শতক। শেষ পর্যন্ত ৯৬ বলে ১১৩ রানে অপরাজিত থেকে পাকিস্তানের অবিশ্বাস্য জয়ের নায়ক হয়ে ওঠেন তিনি। অন্য প্রান্তে হারিস রউফ ১৯ বলে অপরাজিত ৭ রান করেন। শেষ উইকেটে দুজন গড়েন অবিচ্ছিন্ন ৮৯ রানের জুটির অবিশ্বাস্য নজির।
৪৮তম ওভারের প্রথম বলেই হেনরি ক্রোকম্বকে চার মেরে পাকিস্তানের জয় নিশ্চিত করেন হারিস রউফ। মুহূর্তেই উল্লাসে ফেটে পড়ে গাদ্দাফি স্টেডিয়াম।
এই জয় পাকিস্তানের জন্য স্বস্তির হলেও ব্যাটিং ব্যর্থতা নিয়ে বড় প্রশ্ন রেখে গেল। মাত্র ২৪২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ৯ উইকেট হারানো, বিশেষ করে টপ ও মিডল অর্ডারের ধারাবাহিক ব্যর্থতা দলটির জন্য উদ্বেগজনক। শেষ পর্যন্ত শাদাবের অবিশ্বাস্য ইনিংস পাকিস্তানকে পরাজয়ের লজ্জা থেকে বাঁচিয়েছে।
অন্যদিকে ইংল্যান্ডের জন্য এই হার আরও বেশি হতাশার। ১৫৪ রানে পাকিস্তানের ৯ উইকেট তুলে নিয়ে জয়ের সুবর্ণ সুযোগ পেয়েও শেষ উইকেটটি নিতে পারেননি ইংলিশ বোলাররা।
এর আগে ত্রিদেশীয় সিরিজে পাকিস্তান ইংল্যান্ডকে ৮৭ রানে হারিয়েছিল। এবারও জয় পেল তারা, তবে আগের ম্যাচের দাপুটে পারফরম্যান্সের সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা গেল লাহোরে।
এক উইকেটের এই নাটকীয় জয়ে ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করেছে পাকিস্তান। তবে জয়ের আনন্দের মধ্যেও বড় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—শাদাব খান যদি এমন অসাধারণ ইনিংস না খেলতেন, তাহলে সহজ লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে আরও একটি বিব্রতকর পরাজয়ের গল্পই কি লিখত পাকিস্তান?
ম্যাচের সংক্ষিপ্ত স্কোর
ইংল্যান্ড: ২৪১ অলআউট (৪৬.৪ ওভার)।
পাকিস্তান: ২৪৩/৯ (৪৭.১ ওভার)।
ফলাফল: পাকিস্তান ১ উইকেটে জয়ী।
জয়ের নায়ক: শাদাব খান—১১৩ (৯৬ বল)।*
মন্তব্য করুন