যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় গ্রেপ্তার সাত আসামিকে দুই দিন করে রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। রিমান্ড শুনানিতে বিপুলসংখ্যক চাকরিপ্রার্থীর প্রবেশপত্র, ব্যাংকের চেক ও স্ট্যাম্প উদ্ধারের বিষয়টি উঠে আসে। এসব নথিপত্রের বিষয়ে বিচারকের প্রশ্নের মুখে এক আসামির দেওয়া জবাব ঘিরে আদালতকক্ষে তৈরি হয় আলোচনার পরিবেশ।
রোববার (২৫ অক্টোবর) ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলামের আদালতে শুনানি শেষে সাত আসামির প্রত্যেকের দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়।
রিমান্ডপ্রাপ্তরা হলেন মো. মফিজুল ইসলাম (২৭), মো. রুবেল ইসলাম (৩৩), মো. হাসিনুর রহমান ওরফে সুজন (৩২), আসাদুল ইসলাম (৩১), এস এম এমদাদুল রহমান (৩৫), মো. জাহাঙ্গীর আলম (৩৮) ও নূর মোহাম্মদ (৩০)।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজন বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে কর্মরত। নূর মোহাম্মদ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অফিস সহায়ক, আসাদুল ইসলাম প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক এবং রুবেল ইসলাম পরিবেশ অধিদপ্তরের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর হিসেবে কাজ করেন। অন্যদিকে মফিজুল ও হাসিনুরকে প্রশ্নপত্র ফাঁসকারী চক্রের সদস্য হিসেবে শনাক্ত করেছে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
আদালতে আসামিদের সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার মো. মোহাইমিনুল ইসলাম।
শুনানিতে তদন্ত কর্মকর্তা জানান, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা সংঘবদ্ধভাবে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায়ের বিনিময়ে পরীক্ষার আগেই প্রশ্নপত্র সরবরাহ এবং উত্তর মুখস্থ করিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতেন তাঁরা বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিচারকের প্রশ্নে আসামির অদ্ভুত জবাব
শুনানির একপর্যায়ে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক আসাদুল ইসলামের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন নথিপত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বিচারক।
তদন্তসংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, তাঁর কাছে ও মোবাইল ফোনে বিপুলসংখ্যক স্ট্যাম্প, চেক এবং চাকরিপ্রার্থীদের প্রবেশপত্র পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৪৫টি চেকের পাতাও ছিল।
এত চেক ও স্ট্যাম্প রাখার কারণ জানতে চাইলে আসাদুল দাবি করেন, তাঁর একটি ছোট ব্যবসা রয়েছে। সরকারি চাকরির পাশাপাশি ব্যবসা করার বিষয়ে বিচারক প্রশ্ন তুললে তিনি জানান, ব্যবসাটি তাঁর স্ত্রীর নামে।
এরপর বিচারক জানতে চান, এতসংখ্যক চাকরিপ্রার্থীর প্রবেশপত্র তাঁর কাছে কেন রয়েছে। জবাবে আসাদুল বলেন, তাঁর শালা ও সম্বন্ধীরা পরীক্ষার্থী ছিলেন।
তবে বিপুলসংখ্যক প্রবেশপত্র তাঁর মোবাইল ফোনে থাকার কারণ সম্পর্কে বিচারক আরও প্রশ্ন করেন।
১০ লাখ টাকায় প্রশ্নপত্র দেওয়ার অভিযোগ
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীক্ষার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্নপত্র ও উত্তর ছড়িয়ে পড়ে।
ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সঙ্গে মূল পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের মিল পাওয়ার পর কর্তৃপক্ষ পরীক্ষা স্থগিত করে।
পরবর্তী সময়ে তদন্তে উঠে আসে, চাকরি নিশ্চিত করার প্রলোভন দেখিয়ে পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে প্রশ্নপত্র ও উত্তর সরবরাহের চুক্তি করেছিল অভিযুক্ত চক্রটি।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে ১০০ টাকা মূল্যমানের ১১৬টি স্ট্যাম্প, চাকরিপ্রার্থীদের ১০টি সনদ, ৪০ জনের ব্যাংক চেকের পাতা এবং চেক বই জব্দ করা হয়েছে বলে তদন্তে জানানো হয়।
আরও ১১ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের পরিকল্পনার অভিযোগ
শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী কাওসার আহম্মেদ দাবি করেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা শুধু একটি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। তাঁদের আরও ১১টি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের পরিকল্পনা ছিল।
তবে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, তাঁদের মক্কেলদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই রিমান্ড চাওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে আসামি এস এম এমদাদুল রহমানের পক্ষে শুনানিতে আইনজীবী খোরশেদ আলম দাবি করেন, তাঁর মক্কেল এজাহারভুক্ত আসামি নন এবং তাঁর বিরুদ্ধে কোনো গ্রহণযোগ্য আলামত পাওয়া যায়নি।
এ সময় তদন্ত কর্মকর্তা আদালতকে জানান, সংশ্লিষ্ট আসামির বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ আলামত পাওয়া গেছে এবং তিনি সংঘবদ্ধ চক্রটির সঙ্গে জড়িত বলে তদন্তে তথ্য রয়েছে।
সিআইডির পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, প্রশ্নপত্র ফাঁসের এই চক্রের সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আরও কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং অন্য ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত ও জড়িত অন্যদের আইনের আওতায় আনতে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন।
দীর্ঘ শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শোনার পর আদালত সাত আসামির প্রত্যেকের দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের এই ঘটনায় সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সামনে আসায় নিয়োগ পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। তবে তদন্ত চলমান থাকায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
মন্তব্য করুন