নিউজ ডেস্ক | লিড নিউজ ২৪:
সৌদি আরবের মক্কায় দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় নতুন করে কূটনৈতিক প্রশ্ন তুলেছে বাংলাদেশ। সৌদি কর্তৃপক্ষের পাঠানো বন্দিদের তালিকায় তাঁদের নাম এবং অপরাধের বিবরণ থাকলেও মৃত্যুদণ্ডের মতো গুরুতর সাজার তথ্য উল্লেখ করা হয়নি। কেন এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাংলাদেশকে জানানো হয়নি, তার ব্যাখ্যা চেয়েছে ঢাকা।
একই সঙ্গে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই বাংলাদেশির বিচারিক প্রক্রিয়া, আদালতের রায় এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত নথি চেয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশি হলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নজরুল ইসলাম ও টাঙ্গাইলের সুইটি আক্তার।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) সৌদি আরবের জেদ্দায় দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক ফরিদ বিন সাদ আল সেহেরির সঙ্গে বৈঠক করেন বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল মো. সাখাওয়াত হোসেন। বৈঠকে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড সম্পর্কে আগাম তথ্য না দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপন করা হয়।
কূটনৈতিক সূত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়, বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হলে নিয়মিত পাঠানো বন্দিতালিকায় সেই তথ্য কেন অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। বিষয়টির সন্তোষজনক ব্যাখ্যা বৈঠকে পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে।
বন্দিতালিকায় নাম থাকলেও ছিল না মৃত্যুদণ্ডের উল্লেখ
গত ৩০ সেপ্টেম্বর সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটে দেশটির কারাগারে আটক বাংলাদেশিদের একটি তালিকা পাঠায়। ওই তালিকায় নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তালিকায় নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে তথ্যপ্রযুক্তিসংক্রান্ত অপরাধ এবং সুইটি আক্তারের বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ উল্লেখ করা হয়। তবে তাঁদের কারও বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে, এমন কোনো তথ্য সেখানে ছিল না।
পরবর্তী সময়ে ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশ করে।
সৌদি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, মক্কার একটি মসজিদের ভেতরে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। বিচার শেষে আদালত মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন এবং উচ্চতর বিচারিক কর্তৃপক্ষ রায় বহাল রাখার পর তা কার্যকর করা হয়।
তবে বন্দিতালিকায় উল্লেখ করা অপরাধের বিবরণ, মৃত্যুদণ্ডের রায় এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনো বাংলাদেশের কাছে স্পষ্ট নয়।
২০২৩ সালে গ্রেপ্তার হন দুজন
জানা গেছে, নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তার ২০২২ সালের শেষ দিকে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে যান। সেখানে তাঁরা আল মাজাল নামের একটি প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন।
২০২৩ সালের ১ আগস্ট নজরুল ইসলাম এবং পরদিন ২ আগস্ট সুইটি আক্তারকে সৌদি কর্তৃপক্ষ গ্রেপ্তার করে।
গ্রেপ্তারের পর দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকা অবস্থায় তাঁদের বিরুদ্ধে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। কিন্তু সেই বিচারের অগ্রগতি কিংবা মৃত্যুদণ্ডের চূড়ান্ত রায় সম্পর্কে বাংলাদেশ মিশনকে যথাযথভাবে অবহিত করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিয়েও প্রশ্ন
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পাঠানো নতুন কূটনৈতিক পত্রে দুই বাংলাদেশির মামলার বিস্তারিত বিবরণ, আদালতের সিদ্ধান্ত এবং আপিল প্রক্রিয়াসংক্রান্ত নথি চাওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে বিচার চলাকালে তাঁরা পর্যাপ্ত আইনি সহায়তা পেয়েছিলেন কি না এবং দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আত্মপক্ষ সমর্থন বা আপিলের সুযোগ কতটা পেয়েছিলেন, সে বিষয়গুলো স্পষ্ট করতে চায় ঢাকা।
কূটনৈতিক আলোচনায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মৃত্যুদণ্ডের বিষয়টি আগে জানা থাকলে সংশ্লিষ্ট নাগরিকদের প্রয়োজনীয় কনস্যুলার ও আইনি সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হতো।
সৌদি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নিম্ন আদালতের রায়ের পর আপিল পর্যায়েও দণ্ডাদেশ বহাল রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে দেশটির প্রচলিত আইন অনুযায়ী সাজা কার্যকর করা হয়েছে।
দফায় দফায় কূটনৈতিক যোগাযোগ
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংবাদ প্রকাশের পর ১৫ অক্টোবর জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত তথ্য চায়।
এরপর ১৮ অক্টোবর ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকে একই বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। পরদিন জেদ্দায় দুই দেশের কূটনৈতিক কর্মকর্তাদের মধ্যে অনুষ্ঠিত আলোচনায় আবারও বিষয়টি উত্থাপিত হয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সৌদি আদালতের রায়ের অনুলিপিসহ প্রয়োজনীয় নথি পাওয়ার পর পুরো ঘটনা পর্যালোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে।
এদিকে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনাকে হতাশাজনক বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তিনি দুই দেশের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান ও কূটনৈতিক যোগাযোগে ঘাটতি থাকার বিষয়টি সামনে এনেছেন।
অন্যদিকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানিয়েছেন, সৌদি আদালতের রায়ের অনুলিপি হাতে না পাওয়া পর্যন্ত পুরো ঘটনা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
প্রবাসীদের আইনি সুরক্ষা নিয়ে গুরুত্ব বাড়ছে
ঘটনাটি বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি নাগরিকদের আইনি সুরক্ষা ও কনস্যুলার সহায়তার বিষয়টিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
বিশেষ করে কোনো বাংলাদেশি বিদেশে গুরুতর ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত হলে সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ দূতাবাস এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সময়মতো তথ্য বিনিময়ের গুরুত্ব সামনে এসেছে।
সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার এবং দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক অংশীদার। ফলে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড নিয়ে তৈরি হওয়া প্রশ্নগুলোর সমাধান কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই করতে চাইছে ঢাকা।
এখন সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ বিচারিক নথি ও আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে বাংলাদেশ।
মন্তব্য করুন