চীনের রাজধানী বেইজিং থেকে চার ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত ইনার মঙ্গোলিয়ার বিস্তীর্ণ তৃণভূমি এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক ডেটা সেন্টারের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে রূপ নিচ্ছে। একসময় ‘আলুর রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত উলানচাব শহরে ‘অ্যাপল বুলেভার্ড’, ‘আলিবাবা বুলেভার্ড’ ও ‘হুয়াওয়ে বুলেভার্ড’-এর মতো অবকাঠামো এবং বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর উপস্থিতি এ অঞ্চলের গভীর অর্থনৈতিক রূপান্তরের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিগত দুই বছরেরও কম সময়ে ইনার মঙ্গোলিয়ার কম্পিউটিং সক্ষমতা প্রায় চার গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৬ সালের আগস্ট নাগাদ ৩ লাখ ৬৩ হাজার পেটাফ্লপসে দাঁড়িয়েছে। ২০২৬ সালের প্রথমার্ধ পর্যন্ত চীনের শীর্ষ ৩০টি বেসরকারি কম্পিউটিং প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২০টি এবং শীর্ষ ১০টি কম্পিউটিং সেবা প্রদানকারীর মধ্যে নয়টি প্রতিষ্ঠানই এখানে কার্যক্রম স্থাপন করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত বিনিয়োগের পরিমাণ ২০০ বিলিয়ন ইউয়ান বা প্রায় ২ হাজার ৯৭৫ কোটি মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে।
এআই সার্ভার পরিচালনার জন্য প্রচুর বিদ্যুৎ ও শীতলীকরণ ব্যবস্থার প্রয়োজন হলেও অনুকূল আবহাওয়া অঞ্চলটিকে বড় সুবিধা দিচ্ছে। এখানকার বাইরের ঠান্ডা বাতাসের কারণে বছরের প্রায় ১০ মাস স্বাভাবিকভাবেই সার্ভার শীতল রাখা যায়। এছাড়া পর্যাপ্ত বায়ু ও সৌরবিদ্যুতের কারণে প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুতের দাম প্রায় ০.৩৫ ইউয়ানে নেমে এসেছে। পাশাপাশি বেইজিংয়ের কাছাকাছি হওয়ায় তথ্য আদান-প্রদানে বিলম্ব পাঁচ মিলিসেকেন্ডেরও কম থাকে, যা এআই মডেল প্রশিক্ষণে কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
পরিবেশ সুরক্ষায় উলানচাব চাহার হাই-টেক উন্নয়ন অঞ্চলে একটি শূন্য-কার্বন শিল্পপার্ক গড়ে তোলা হচ্ছে। উলানচাব পৌর উন্নয়ন ও সংস্কার কমিশনের উপপরিচালক চেন ঝিগাং জানান, শিল্পপার্কের আশপাশে প্রায় ১০ গিগাওয়াট বায়ু ও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে, যা থেকে বছরে ৩০০০ কোটি কিলোওয়াট-ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। একই সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে ভিনেট গ্রুপের মতো কেন্দ্রগুলো ফ্লুরিন-পাম্প প্রযুক্তির পাশাপাশি কেবল পুনর্ব্যবহৃত পানি ব্যবহার করছে।
তবে অঞ্চলটি কেবল সস্তা জমি ও বিদ্যুতের ওপর ভিত্তি করে ‘সার্ভার কক্ষের মালিক’ হয়ে থাকতে চায় না। উলানচাবের বিগ ডেটা প্রশাসনের উপপরিচালক লিউ হুয়ানসুও সতর্ক করে জানান, অবকাঠামোর তুলনায় আয় ও কর্মসংস্থান বাড়াতে অর্থনৈতিক মূল্যশৃঙ্খলের শীর্ষে ওঠা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে ২০২৬ থেকে ২০২৮ সাল মেয়াদি কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে শহরটি ‘টোকেনের রাজধানী’ হয়ে ওঠার রূপরেখা বাস্তবায়ন করছে।
ইতিমধ্যে গত ৩০ মে হোহহটের হোরিঙ্গার নিউ এরিয়ায় চীনের প্রথম পরিবেশবান্ধব কম্পিউটিংভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ টোকেন ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম চালু হয়েছে। হোরিঙ্গার নিউ এরিয়া প্রশাসনিক কমিটির উপপরিচালক গুও জুইং জানান, লক্ষ্য হচ্ছে কাঁচা কম্পিউটিং সক্ষমতাকে পরিমাপযোগ্য বাণিজ্য ও উচ্চমূল্যের এআই সেবায় রূপ দেওয়া। বর্তমানে হোহহটে দুগ্ধশিল্প ও স্মার্ট পশুচারণভূমিতে গবাদিপশুর মুখমণ্ডল শনাক্তকরণসহ বিভিন্ন খাতে প্রায় ১০০টি এআই প্রয়োগের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।
মন্তব্য করুন