সায়মন খান | লিড নিউজ ২৪
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে অবমাননার অভিযোগে ইরানের ২৩ বছর বয়সী এক তরুণীকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছেন দেশটির আদালত। নাজমেহ আমিনি নামের ওই তরুণীকে পৃথক আরেকটি মামলায় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাবিরোধী কর্মকাণ্ড ও সরকারবিরোধী প্রচারণার অভিযোগে ১২ বছরের বেশি কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তবে তাঁর মৃত্যুদণ্ডের রায় এখনো চূড়ান্ত হয়নি। দেশটির সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করার সুযোগ রয়েছে।
নাজমেহ আমিনি ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় মাশহাদ শহরের বাসিন্দা এবং হিসাববিজ্ঞানের শিক্ষার্থী। বর্তমানে তিনি মাশহাদের ভাকিলাবাদ কারাগারে বন্দি রয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায়কে কেন্দ্র করে দেশটির বিচারব্যবস্থা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং মৃত্যুদণ্ডের ক্রমবর্ধমান প্রয়োগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি পোস্টের জেরে আমিনির বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ আনা হয়। ইরানের প্রচলিত আইনে এ ধরনের অপরাধকে ‘সাব-উল-নবি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে যে পোস্টকে কেন্দ্র করে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, সেটির বিস্তারিত বিষয়বস্তু প্রকাশ করা হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস ইন ইরানের (এইচআরএআই) তথ্য অনুযায়ী, আমিনির পরিবারের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র তাঁর বিরুদ্ধে দুটি পৃথক মামলার বিচারিক কার্যক্রমের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
এর মধ্যে মাশহাদের ফৌজদারি আদালতে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। অন্যদিকে বিপ্লবী আদালতে জাতীয় নিরাপত্তাবিরোধী কর্মকাণ্ড ও সরকারবিরোধী প্রচারণাসহ কয়েকটি অভিযোগে তাঁকে ১২ বছর ছয় মাস এক দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ইরানজুড়ে ছড়িয়ে পড়া সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে আটক হন আমিনি। ওই আন্দোলন দমনে ব্যাপক অভিযান চালায় দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের হিসাবে, ওই সময় হাজারো মানুষ নিহত হন এবং ৫০ হাজারের বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এদিকে ইরানের সাইবার পুলিশের নজরদারির পর গত ৩ ফেব্রুয়ারি ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে আমিনিকে গ্রেপ্তারের তথ্যও সামনে এসেছে।
কারাগার থেকে প্রকাশিত একটি অডিও বার্তায় আমিনি জানিয়েছেন, গত ১৬ সেপ্টেম্বর তাঁর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়েছে। নিজের বিচারপ্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে তিনি জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ও আইনজীবীদের সহায়তা চেয়েছেন।
ওই বার্তায় তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, তাঁর অনেক স্বপ্ন রয়েছে এবং পরিবার তাঁর অপেক্ষায় আছে। মৃত্যুদণ্ডের আশঙ্কায় পরিবারের সদস্যরা প্রতিনিয়ত উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তাঁর আবেদন, তাঁরা যেন তাঁর পক্ষে কথা বলেন এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখেন।
এদিকে ইরানের সংবাদপত্র খোরাসানে প্রকাশিত বিচারিক কার্যক্রমের বিবরণ অনুযায়ী, আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে গিয়ে আমিনি দাবি করেন, বন্ধুদের সঙ্গে মাদকজাতীয় মাশরুম গ্রহণের পর বিভ্রমের মধ্যে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্কিত মন্তব্যগুলো প্রকাশ করেছিলেন।
তাঁর আইনজীবীও যুক্তি দেন, মন্তব্যগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল না। তবে সংশ্লিষ্ট বিচারক আত্মপক্ষ সমর্থনের এসব যুক্তি গ্রহণ করেননি।
ইরানের ইসলামি দণ্ডবিধির ২৬২ ধারায় মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এবং নির্দিষ্ট কিছু পবিত্র ধর্মীয় ব্যক্তিত্বকে অবমাননার জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে একই আইনের ২৬৩ ধারায় অনিচ্ছাকৃত বক্তব্য, ভুলবশত মন্তব্য কিংবা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় সংঘটিত ঘটনার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্তে মৃত্যুদণ্ড থেকে অব্যাহতির সুযোগ রাখা হয়েছে।
আমিনির ক্ষেত্রে এসব আইনি সুযোগ যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটসের পরিচালক মাহমুদ আমিরি-মোগাদ্দাম এ রায়কে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন।
তাঁর মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্যের কারণে একজন তরুণীর মৃত্যুদণ্ডের রায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি এ ধরনের ঘটনায় মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগের পরিধি আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আমিনির মৃত্যুদণ্ডের রায় বাতিল এবং ইরানে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিতের দাবি জোরালো করার আহ্বান জানিয়েছেন।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাবে, চলতি বছর ইরানে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ইরান হিউম্যান রাইটসের তথ্য অনুযায়ী, ১০ অক্টোবর পর্যন্ত দেশটিতে অন্তত ৬১৭ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
তবে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা তুলনামূলকভাবে বিরল। সর্বশেষ আলোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে ২০২৩ সালের ৮ মে ইউসুফ মেহরাদ ও সদরুল্লাহ ফাজেলি-জারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্ম অবমাননাসংক্রান্ত কর্মকাণ্ডের অভিযোগে তাঁদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল।
এদিকে নাজমেহ আমিনির মৃত্যুদণ্ডের রায় এখনো ইরানের সর্বোচ্চ আদালত বহাল রাখেননি। ফলে আপিল প্রক্রিয়ায় তাঁর সাজা পরিবর্তন কিংবা বাতিলের আইনগত সুযোগ রয়েছে।
তবে এই রায়কে ঘিরে ইরানে মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার, বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং নাগরিকদের মতপ্রকাশের অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মহলে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মন্তব্য করুন