আন্তর্জাতিক ডেস্ক | লিড নিউজ ২৪
বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
রাশিয়ার সঙ্গে চলমান যুদ্ধের মধ্যেই নতুন সংকটে পড়েছে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী। মার্কিন ধনকুবের ইলন মাস্কের মালিকানাধীন স্পেসএক্সের স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবায় আকস্মিক বিধিনিষেধ আরোপের কারণে দেশটির বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অভিযান ব্যাহত হয়েছে। বিশেষ করে দ্রুতগতির ড্রোন পরিচালনা ও যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাযোগব্যবস্থায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সামরিক প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সেরহি বেসক্রেস্তনভ এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তাঁর দাবি, কোনো ধরনের আগাম সতর্কতা ছাড়াই মঙ্গলবার রাত থেকে স্টারলিংকের সামরিক সংস্করণ ‘স্টারশিল্ড’-এর ওপর নতুন সীমাবদ্ধতা কার্যকর করা হয়েছে। ফলে পরিকল্পিত কয়েকটি অভিযান সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারেনি ইউক্রেনীয় বাহিনী।
ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ঘণ্টায় প্রায় ১৬০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে চলমান স্টারলিংক টার্মিনালগুলোতে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। এতে দূরপাল্লার ড্রোন নিয়ন্ত্রণে জটিলতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে রাশিয়ার দখলে থাকা ইউক্রেনের পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলে পরিচালিত সামরিক অভিযানে এই প্রযুক্তির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল দেশটির সশস্ত্র বাহিনী।
প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির উপদেষ্টা বেসক্রেস্তনভ জানিয়েছেন, স্পেসএক্সের এমন সিদ্ধান্তের বিষয়ে ইউক্রেনীয় সামরিক কর্তৃপক্ষকে আগে থেকে অবহিত করা হয়নি। তাঁর মতে, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে এই সিদ্ধান্তের সম্পর্ক থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এদিকে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবক ও রাজনৈতিক কর্মী সেরহি স্টেরনেনকো অভিযোগ করেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের অনুরোধে স্পেসএক্স এ ধরনের পদক্ষেপ নিয়ে থাকতে পারে। তবে তাঁর অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। স্পেসএক্সের পক্ষ থেকেও বিধিনিষেধ আরোপের কারণ সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
ইউক্রেনীয় সামরিক সূত্রের দাবি, সাধারণ স্টারলিংক সেবা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। মূলত দ্রুতগতিতে চলমান সামরিক ড্রোনের জন্য ব্যবহৃত বিশেষ সংযোগব্যবস্থায় সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে। এতে যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাযোগ ও নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এরই মধ্যে রাশিয়ার তেল শোধনাগারসহ জ্বালানি অবকাঠামোয় ইউক্রেনের দূরপাল্লার হামলা বন্ধ করতে কিয়েভের ওপর চাপ বাড়িয়েছে ওয়াশিংটন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির জন্য রাশিয়ার তেল স্থাপনায় ইউক্রেনীয় হামলাকে দায়ী করেছেন। তবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি ঘিরে চলমান সংকটও বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির একটি বড় কারণ।
এমন পরিস্থিতিতে স্টারলিংকের ওপর নতুন বিধিনিষেধ আরোপের ঘটনা ওয়াশিংটন ও কিয়েভের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা কার্যক্রমে মার্কিন প্রযুক্তির ওপর ব্যাপক নির্ভরশীলতা দেশটির জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
অন্যদিকে স্টারলিংক সংকটের মধ্যেই ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ ও খারকিভসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার রাতে রুশ বাহিনী ৩৯টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং অন্তত ১২০টি হামলাকারী ড্রোন ব্যবহার করে ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে আক্রমণ চালায়।
হামলায় একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে অন্তত ছয় লাখ মানুষ বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলেও সতর্ক করেছে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ।
জেলেনস্কি অভিযোগ করেছেন, রাশিয়ার বড় ধরনের এই হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় গোয়েন্দা সতর্কবার্তা পায়নি ইউক্রেন। দীর্ঘদিন ধরে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার বিষয়ে আগাম গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে ইউক্রেনকে সহায়তা করে আসছিল ওয়াশিংটন। কিন্তু সাম্প্রতিক হামলার আগে সেই সহযোগিতার ঘাটতি দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট রাশিয়ার সর্বশেষ হামলাকে পরিকল্পিত ও উসকানিমূলক আখ্যা দিয়ে বলেছেন, এ ধরনের আক্রমণ আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার প্রতি মস্কোর অনীহাই প্রকাশ করছে। একই সঙ্গে চলমান সংঘাত নিরসনে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগকে রাশিয়া যথাযথ গুরুত্ব দিচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকেই ইউক্রেনের যোগাযোগব্যবস্থা সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে স্টারলিংক। যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাদের মধ্যে যোগাযোগ, ড্রোন পরিচালনা, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং সামরিক সমন্বয়ের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
সামরিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আধুনিক যুদ্ধব্যবস্থায় স্যাটেলাইটভিত্তিক যোগাযোগ প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীলতা ক্রমেই বাড়ছে। ফলে এমন গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত হলে তা সরাসরি সামরিক অভিযানের সক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
স্টারলিংক নিয়ে সর্বশেষ পরিস্থিতি ইউক্রেনের সামনে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। রাশিয়ার সামরিক চাপ মোকাবিলার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ প্রযুক্তির বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তাও এখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ক্ষেত্রে বিদেশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, নতুন করে সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে।
মন্তব্য করুন