সায়মন খান | লিড নিউজ ২৪
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকা সংশোধনে কথিত অনিয়মের প্রতিবাদে আন্দোলন আরও জোরদার করার ঘোষণা দিয়েছে দেশটির বিরোধী রাজনৈতিক জোট ‘ইন্ডিয়া’। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দুর্বল করার অভিযোগ তুলে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী বলেছেন, সংবিধান ও ভোটাধিকার রক্ষার আন্দোলন থেকে বিরোধীরা কোনো অবস্থাতেই সরে আসবে না।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) নয়াদিল্লিতে রাহুল গান্ধীর বাসভবনে বিরোধী জোটের শীর্ষ নেতাদের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের পর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলা হয়। বৈঠকে রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশি বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও অংশ নেন।
ভারতের লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী অভিযোগ করেন, দেশটির গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের চেষ্টা চলছে। বিশেষ করে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাঁর দাবি, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের উদ্দেশে কঠোর বার্তা দিয়ে রাহুল বলেন, সংবিধান ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের একদিন জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে। তাঁদের ঘিরে চাপ ক্রমেই বাড়ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বৈঠক শেষে বিরোধী ঐক্যের বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেন কংগ্রেসের এই নেতা। তিনি জানান, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে এখন থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ছাত্রসংগঠন ও নাগরিক সমাজের আন্দোলনকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।
রাহুলের ভাষ্য অনুযায়ী, বিরোধীদের লক্ষ্য আলাদা কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি তৈরি করা নয়; বরং জনগণের ভোটাধিকার ও সাংবিধানিক অধিকার রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলা।
বৈঠকে অংশ নেওয়া বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিদের প্রয়োজন হলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আন্দোলনে নামার প্রস্তুতি রাখার আহ্বান জানানো হয়। তবে পরবর্তী বড় কর্মসূচির বিস্তারিত এখনই প্রকাশ করতে চাননি বিরোধী নেতারা।
কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে বলেন, দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষার প্রশ্নে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের এক মঞ্চে আসা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই ঐক্য আগামী দিনের আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী, রাষ্ট্রীয় জনতা দলের নেতা তেজস্বী যাদব, কংগ্রেস নেতা শশী থারুর, এনসিপি নেত্রী সুপ্রিয়া সুলে, তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ সাগরিকা ঘোষসহ একাধিক রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্থানীয় নেতা। এ ছাড়া ছাত্রনেত্রী নেহা বোরা এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও আলোচনায় অংশ নেন।
এদিকে নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের অনুমোদন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েও তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিরোধী নেতারা। দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, যন্তর মন্তরের পরিবর্তে রাজধানীর তিনটি বিকল্প স্থান বিক্ষোভ কর্মসূচির জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে সরকারের এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে রাজি নয় বিরোধী জোট। রাহুল গান্ধীর অভিযোগ, সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ করার সুযোগ সীমিত করতেই এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সিদ্ধান্তটি চ্যালেঞ্জ করার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
রাষ্ট্রীয় জনতা দলের নেতা তেজস্বী যাদবও নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। অন্যদিকে এনসিপি নেত্রী সুপ্রিয়া সুলে বলেছেন, সংবিধান ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার প্রয়োজনেই বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো এক জায়গায় এসেছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ সাগরিকা ঘোষ জানিয়েছেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
এর আগে সোমবার (১২ অক্টোবর) ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিল করেন বিরোধী নেতারা। পরে নির্বাচনসংক্রান্ত অভিযোগের প্রতিকার চেয়ে সর্বোচ্চ আদালতে আবেদন করা হয়।
তবে অনুমতি ছাড়া মিছিল এবং পুলিশের ব্যারিকেড ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগে ওই কর্মসূচির ঘটনায় দুটি মামলা করেছে দিল্লি পুলিশ।
ভারতের নির্বাচন কমিশন অবশ্য রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব ও ভোটার তালিকায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ক্ষমতাসীন বিজেপিও বিরোধীদের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, বৈধ নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার মাধ্যমে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
এমন পরিস্থিতিতে ভারতের রাজনীতিতে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা, ভোটার তালিকার নির্ভরযোগ্যতা এবং নাগরিকদের প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিকে কেন্দ্র করে বিরোধীদের এই ঐক্য সরকারবিরোধী আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। তবে আন্দোলনের পরবর্তী গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করবে সুপ্রিম কোর্টে চলমান আইনি প্রক্রিয়া এবং বিরোধী জোটের ভবিষ্যৎ কর্মসূচির ওপর।
মন্তব্য করুন