সায়মন খান: লিড নউজ ২৪|
লিওনেল মেসির বিদায়ের মধ্য দিয়ে আর্জেন্টিনা ফুটবল প্রবেশ করতে যাচ্ছে এক নতুন যুগে। প্রায় দুই দশক ধরে যে ১০ নম্বর জার্সি মানেই ছিল মেসি—এখন সেই জার্সির নতুন উত্তরসূরি খুঁজতে হবে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। তবে প্রশ্নটা শুধু একজন খেলোয়াড়কে ১০ নম্বর জার্সি দেওয়ার নয়; বরং মেসির মতো একজনের অনুপস্থিতিতে আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগের নেতৃত্ব কে নেবেন, সেটিই এখন বড় আলোচনার বিষয়।
আর্জেন্টিনার হয়ে ২০৮তম ও শেষ ম্যাচ খেলেই আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানাচ্ছেন মেসি। বেনিনের বিপক্ষে এই ম্যাচের মধ্য দিয়ে শেষ হবে জাতীয় দলের জার্সিতে তাঁর দীর্ঘ অধ্যায়। আর্জেন্টিনার হয়ে সর্বোচ্চ ১২৫ গোল এবং সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ডও এখন মেসির দখলে। তাঁর নেতৃত্বেই আর্জেন্টিনা জিতেছে ২০২২ বিশ্বকাপ ও টানা দুটি কোপা আমেরিকা। ফলে তাঁর জায়গা পূরণ করা যে প্রায় অসম্ভব, সেটি স্বীকার করতেই হবে।
মেসির বিদায়ের পর সবচেয়ে বড় প্রতীকী পরিবর্তন হতে যাচ্ছে তাঁর বিখ্যাত ১০ নম্বর জার্সিতে। আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি অবশ্য এখনো সিদ্ধান্ত নেননি, শেষ পর্যন্ত কার গায়ে উঠবে এই ঐতিহাসিক জার্সি। আপাতত মেসির শেষ ম্যাচ পর্যন্ত জার্সিটি অন্য কাউকে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মেসির সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে সবচেয়ে নিরাপদ নাম হতে পারে জুলিয়ান আলভারেজ। ২০২৬ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে মেসির অনুপস্থিতিতে আক্রমণভাগে তাঁর দায়িত্ব বেড়েছিল। বড় ম্যাচে গোল করার পাশাপাশি প্রেসিং, দৌড় এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণে চাপ তৈরির ক্ষেত্রেও আলভারেজ ইতিমধ্যে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন। ক্লাব ফুটবলেও ম্যানচেস্টার সিটি ও অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের হয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। তবে মেসির মতো সৃজনশীল প্লেমেকার হিসেবে আলভারেজের ধরন একেবারেই আলাদা।
আর মেসির সঙ্গে খেলার ধরন সবচেয়ে বেশি মেলে যে তরুণের, তিনি নিকো পাজ। বাঁ-পায়ের এই আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার ইতালির কোমোর হয়ে নিজের প্রতিভার জানান দিয়েছেন। মাঠের মাঝখান থেকে খেলা তৈরি করা, ড্রিবলিং, পাস দেওয়া এবং সুযোগ তৈরি করার ক্ষেত্রে পাজের দক্ষতা তাঁকে ১০ নম্বর জার্সির অন্যতম স্বাভাবিক দাবিদার করে তুলেছে। মেসি নিজেও পাজের ফুটবলবোধ ও প্রতিভার প্রশংসা করেছেন।
এরপর আলোচনায় আসছে ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুওনো। মাত্র ১৯ বছর বয়সেই আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের ১০ নম্বর জার্সি পরার অভিজ্ঞতা হয়েছে তাঁর। রিভার প্লেটের একাডেমি থেকে উঠে আসা এই তরুণ বর্তমানে ইউরোপের ফুটবলেও নিজের জায়গা তৈরির চেষ্টা করছেন। ডান দিক থেকে ভেতরে ঢুকে আক্রমণ তৈরি করা, ছোট জায়গায় বল নিয়ন্ত্রণ এবং দূরপাল্লার শটে তাঁর দক্ষতা মেসির সঙ্গে কিছুটা মিল তৈরি করে। বয়স কম হলেও আত্মবিশ্বাসের দিক থেকে মাস্তানতুওনোকে ভবিষ্যতের বড় তারকা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আরেকটি সম্ভাব্য নাম থিয়াগো আলমাদা। আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই স্কালোনির পছন্দের খেলোয়াড়দের একজন তিনি। মাঝমাঠের পাশাপাশি দুই প্রান্তেও খেলতে পারেন আলমাদা। ইউরোপে প্রত্যাশা অনুযায়ী সাফল্য না পেলেও আর্জেন্টিনায় ফিরে নিজের সেরা ছন্দে ফেরার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। ফলে জাতীয় দলের ১০ নম্বর জার্সির দৌড়ে তাঁকেও পুরোপুরি বাদ দেওয়া যাচ্ছে না।
তবে মেসির উত্তরসূরি বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে প্রত্যাশার চাপ। মেসির আগে দিয়েগো ম্যারাডোনার ১০ নম্বর জার্সিও একই ধরনের বিশাল চাপ তৈরি করেছিল। ম্যারাডোনার পর একাধিক তারকা এই জার্সি পরেছেন—পাবলো আইমার, আরিয়েল ওর্তেগা ও হুয়ান রোমান রিকেলমে। কিন্তু কেউই দীর্ঘমেয়াদে সেই জার্সির সঙ্গে মেসির মতো একাত্ম হয়ে উঠতে পারেননি।
এবারও তাই একজন খেলোয়াড়কে মেসির সঙ্গে তুলনা করে দেখার পরিবর্তে আর্জেন্টিনাকে হয়তো দলগতভাবেই নতুন পথ খুঁজতে হবে। আলভারেজ, নিকো পাজ, মাস্তানতুওনো, এনজো ফার্নান্দেজ ও অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার—একাধিক খেলোয়াড় মিলে যদি আক্রমণ ও সৃজনশীলতার দায়িত্ব ভাগ করে নিতে পারেন, তাহলে মেসির শূন্যতা কিছুটা হলেও সামাল দেওয়া সম্ভব।
আরেকটি বিষয় হলো, মেসির ১০ নম্বর জার্সি স্থায়ীভাবে অবসরে পাঠানোর সুযোগও নেই। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী বিশ্বকাপের মতো বড় টুর্নামেন্টে নির্দিষ্ট ক্রমে জার্সি নম্বর দিতে হয়। ফলে প্রতীকীভাবে জার্সিটি সংরক্ষণ করা গেলেও একসময় অন্য একজনকে এই ঐতিহাসিক ১০ নম্বর পরতেই হবে।
সব মিলিয়ে, মেসির উত্তরসূরি হিসেবে এখনই একজনকে চূড়ান্তভাবে বেছে নেওয়া কঠিন। নিকো পাজের মধ্যে মেসির সঙ্গে সবচেয়ে বেশি মিল দেখা যায়, মাস্তানতুওনোর মধ্যে রয়েছে সবচেয়ে বেশি ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা, আর আলভারেজ হতে পারেন সবচেয়ে পরীক্ষিত ও নিরাপদ বিকল্প। তবে শেষ পর্যন্ত ১০ নম্বর জার্সি যার গায়েই উঠুক, তাঁকে মেসি হওয়ার চেষ্টা না করে নিজের পরিচয় তৈরি করতেই হবে। কারণ মেসির মতো একজনের উত্তরসূরি হওয়া সম্ভবত কোনো একজনের দায়িত্ব নয়—এটি পুরো আর্জেন্টিনা দলের নতুন প্রজন্মের সম্মিলিত পরীক্ষা।
মন্তব্য করুন