আন্তর্জাতিক ডেস্ক | Lead News 24
ফ্রান্সজুড়ে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। স্কুলের অবকাঠামোর দুরবস্থা, শিক্ষক সংকট, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী এবং শিক্ষাখাতে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না থাকার অভিযোগ তুলে মঙ্গলবার দেশটির বিভিন্ন শহরে হাজারো শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবক রাজপথে নেমেছেন। একই সঙ্গে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবরোধ কর্মসূচিও পালন করা হয়েছে।
রাজধানী প্যারিসসহ মার্সেই, লিওঁ, নঁত, তুলুজ, স্ট্রাসবুর্গ ও রেনসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। ফ্রান্সের প্রায় ৩ হাজার ৭০০ উচ্চবিদ্যালয়ের মধ্যে মঙ্গলবার ৮৯১টিতে ক্লাস পুরোপুরি বা আংশিকভাবে বন্ধ ছিল। তবে শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর দাবি, অবরোধ ও বন্ধের আওতায় পড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, দেশের অনেক স্কুল ভবন দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাবে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। কোথাও শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত চেয়ার-টেবিল নেই, আবার কোথাও শৌচাগারসহ প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। এর পাশাপাশি শিক্ষক সংকট ও অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপেও শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। গ্রীষ্মের তীব্র গরমের সময় অনেক স্কুলে শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় ক্ষোভ আরও বেড়েছে।
প্যারিসের একটি স্কুলের সামনে ভোর থেকেই শিক্ষার্থীরা ডাস্টবিন, ধাতব ব্যারিয়ার ও বিভিন্ন সামগ্রী এনে প্রবেশপথ আটকে দেন। তাদের হাতে ছিল শিক্ষাব্যবস্থায় আরও অর্থ বরাদ্দ, সমতা এবং উন্নত পরিবেশের দাবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড। পুলিশের কঠোর অবস্থানের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন স্লোগান দিতে দেখা যায় আন্দোলনকারীদের।
তবে সব জায়গায় পরিস্থিতি শান্ত ছিল না। মার্সেই ও নঁতের মতো শহরে বড় জমায়েত তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ থাকলেও স্ট্রাসবুর্গ, লিওঁ ও রেনে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। কোথাও কোথাও বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে।
বিক্ষোভ ঘিরে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক সংঘর্ষে শিক্ষার্থী ও পুলিশ সদস্যসহ কয়েকশ মানুষ আহত হয়েছেন। বিশেষ করে ১৫ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীর হাত গুরুতরভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনায় পুলিশের অস্ত্র ব্যবহারের ধরন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশি আচরণ নিয়ে একাধিক তদন্তও শুরু হয়েছে।
ফ্রান্সের জাতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান বিক্ষোভ মোকাবিলায় অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে তরুণদের সঙ্গে সংলাপ এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সংযত আচরণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ বলেছেন, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বাহিনীকে দূরত্ব বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে ভাঙচুর বা সহিংসতা হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর ব্যবস্থা নেবে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নুও শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখার কথা জানিয়েছেন এবং শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের আহ্বান জানিয়েছেন।
শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন শুরু হয়েছিল কয়েক সপ্তাহ আগে প্যারিসের তুলনামূলক দরিদ্র উপশহরের একটি স্কুল থেকে। ধীরে ধীরে তা রাজধানী ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক, অভিভাবক ও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনও আন্দোলনে যুক্ত হচ্ছে। মঙ্গলবারের কর্মসূচিকে এখন পর্যন্ত এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় কর্মসূচিগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ফ্রান্সে আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে এমনিতেই রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ছে। এর মধ্যে তরুণদের এই আন্দোলন সরকারের ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে। শিক্ষার্থীদের একাংশ শুধু শিক্ষা খাতের সংস্কার নয়, সামাজিক বৈষম্য ও ডানপন্থী রাজনীতির উত্থান নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করছে।
সরকারের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে—একদিকে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগের সমাধান করা, অন্যদিকে বিক্ষোভের নামে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আন্দোলন কতটা দীর্ঘায়িত হয় এবং সরকার শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে কী ধরনের বাস্তব পদক্ষেপ নেয়, সেটিই এখন ফ্রান্সের রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মন্তব্য করুন