প্রোস্টেট গ্রন্থি বড় হয়ে যাওয়ার চিকিৎসায় হারবাল কিম্বা ভেষজ ওষুধের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন চিকিৎসকরা। তথাকথিত এসব ভেষজ ওষুধকে নিরাপদ মনে করা হলেও এগুলো স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি বয়ে আনতে পারে বলে তারা সতর্ক করেছেন।
প্রোস্টেট গ্রন্থি বেড়ে যাওয়া বা বিনাইন প্রস্টেটিক এনলার্জমেন্ট (বিপিই)-এর উপসর্গ কমাতে ‘স পালমেটো’সহ বিভিন্ন ভেষজ চিকিৎসা বহুল প্রচলিত। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এই ওষুধগুলো শরীরে ঠিক কীভাবে কাজ করে এবং এদের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আসলে কতটুকু, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট ধারণা নেই।
ইউরোলজিস্ট ও অ্যান্ড্রোলজিস্ট ডা. ইমতিয়াজ এনায়েতউল্লাহ্ বলেন, ‘ভেষজ ওষুধ মানেই নিরাপদ- এই ধারণাটি ভুল। এসব ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে এবং এগুলো অন্য ওষুধের কার্যকারিতায় মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।’
বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো ‘স পালমেটো’ এবং রক্ত জমাট বাঁধা প্রতিরোধী ওষুধের মধ্যে পারস্পরিক বিক্রিয়া। হৃদরোগের চিকিৎসায় এ ধরনের ওষুধ ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
এতে জীবনরক্ষাকারী ওষুধের কার্যকারিতা কমে গিয়ে রক্ত জমাট বাঁধার মতো মারাত্মক জটিলতা তৈরি করতে পারে, যা এমনকি মৃত্যুর কারণও হতে পারে।
যারা দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন রোগে ভুগছেন এবং নিয়মিত একাধিক ওষুধ সেবন করছেন, তাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও অনেক বেশি। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ভেষজ ও প্রচলিত ওষুধ একসঙ্গে খেলে মূল ওষুধের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। তাই যে কোনো ভেষজ চিকিৎসা শুরুর আগে বর্তমানে সেবন করা সব ওষুধ পর্যালোচনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন চিকিৎসকরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মৃদু উপসর্গের ক্ষেত্রে ভেষজ উপাদান হয়তো সামান্য কাজে লাগতে পারে, কিন্তু মাঝারি থেকে গুরুতর সমস্যায় এটি মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ এক্ষেত্রে সুফল অনিশ্চিত এবং ঝুঁকি বেশি। এছাড়া প্রোস্টেট বৃদ্ধির সঙ্গে যদি ক্যান্সারের যোগসূত্র থাকে, তবে ভেষজ ওষুধ ব্যবহারের প্রশ্নই আসে না।
ডা. ইমতিয়াজ বলেন, ‘ভেষজ ওষুধ ব্যবহারের ক্ষেত্রে অবশ্যই একজন ইউরোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ রোগীর নিরাপত্তা, শরীরের অভ্যন্তরীণ অবস্থা এবং ওষুধের সম্ভাব্য বিক্রিয়াগুলো সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরাই সঠিক নির্দেশনা দিতে পারেন।’
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অসংখ্য পুরুষ প্রোস্টেট গ্রন্থি বেড়ে যাওয়ার সমস্যায় ভোগেন। বাংলাদেশেও এই রোগটি নিয়ে বর্তমানে চিকিৎসা মহলে গুরুত্ব বাড়ছে। কারণ সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় এবং আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
মূত্রথলির নিচে এবং প্রস্রাবের নালিকে ঘিরে থাকা প্রোস্টেট গ্রন্থিটি বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই বড় হতে থাকে। এই প্রক্রিয়াটি সাধারণত ক্ষতিকর না হলেও এটি অনেক সময় প্রস্রাবের প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে এবং নানা জটিলতা তৈরি করতে পারে। চিকিৎসকরা প্রোস্টেট গ্রন্থি বেড়ে যাওয়ার তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন: ইনফেকশন বা সংক্রমণ, সাধারণ বৃদ্ধি এবং ক্যান্সার।
প্রোস্টাটাইটিস বা প্রোস্টেট গ্রন্থির সংক্রমণ হলে সাধারণত জ্বর, তলপেটে ব্যথা এবং প্রস্রাবে সমস্যা দেখা দেয়। সাধারণত দীর্ঘমেয়াদী অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের মাধ্যমে এর চিকিৎসা করা হয়। তবে সমস্যা গুরুতর হলে এবং গ্রন্থিতে পুঁজ বা অ্যাবসেস (Abscess) তৈরি হলে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তা বের করার প্রয়োজন হতে পারে।
তবে প্রোস্টেট বৃদ্ধির সবচেয়ে সাধারণ কারণ হলো ‘বিনাইন প্রোস্ট্যাটিক হাইপারপ্লাজিয়া’ (বিপিএইচ)। এটি একটি ক্যান্সারহীন বৃদ্ধি যা বার্ধক্যের একটি স্বাভাবিক অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। এর ফলে রোগীরা সাধারণত প্রস্রাবের গতির দুর্বলতা, রাতে ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া এবং প্রস্রাব করার পরেও মূত্রথলি পুরোপুরি খালি না হওয়ার মতো অস্বস্তিকর লক্ষণের সম্মুখীন হন।
প্রোস্টেট ক্যান্সার হলো তৃতীয় কারণ, যা স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি করে। প্রাথমিক অবস্থায় এর লক্ষণগুলো সাধারণ প্রোস্টেট বৃদ্ধির মতোই মনে হতে পারে, তাই রোগটি সঠিকভাবে শনাক্ত করা অত্যন্ত জরুরি।
ডা. এনায়েতউল্লাহ বলেন, ‘সাধারণ বৃদ্ধি নাকি ক্যান্সার- এই দুইয়ের পার্থক্য বুঝতে আমরা লক্ষণের মাত্রা বা স্কোরিং এবং বিভিন্ন রোগ নির্ণয় পদ্ধতির সমন্বয়ের ওপর নির্ভর করি।’
রোগের তীব্রতা বুঝতে চিকিৎসকরা সাধারণত ‘ইন্টারন্যাশনাল প্রোস্টেট সিম্পটম স্কোর’ (আইপিএসএস) পদ্ধতি ব্যবহার করেন। এছাড়া রোগটি নিশ্চিত করতে ডিজিটাল রেকটাল এক্সামিনেশন, রক্তে প্রোস্টেট-স্পেসিফিক অ্যান্টিজেন (পিএসএ) পরীক্ষা এবং প্রয়োজনভেদে ইমেজিং বা বায়োপসি করা হয়।
মন্তব্য করুন