এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা’ শুনতে সহজ মনে হলেও অনেকের কাছেই এটি বেশ চ্যালেঞ্জিং। অথচ এই ছোট্ট অভ্যাসটি যদি নিয়মিত চর্চা করা যায়, তাহলে তা শরীর ও মস্তিষ্ক দুটোর জন্যই অবিশ্বাস্য উপকার বয়ে আনতে পারে।
শিশুকালে আমরা খুব সহজেই এক পায়ে দাঁড়াতে পারি। ৯-১০ বছর বয়সের মধ্যেই এই দক্ষতা তৈরি হয়, আর ৩০-এর কোঠায় এসে আমরা এতে সবচেয়ে পারদর্শী হই। এরপর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সক্ষমতা কমতে থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ৫০ বছর পেরিয়ে কেউ যদি কয়েক সেকেন্ড এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন, তাহলে সেটি তার সার্বিক স্বাস্থ্য ও বার্ধক্য মোকাবিলার সক্ষমতার একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত।
তাহলে কেন এই সামান্য অনুশীলন এত গুরুত্বপূর্ণ? চলুন জেনে নেওয়া যাক, এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার ৫টি আশ্চর্যজনক উপকারিতা।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়, যা গুরুতর আঘাতের কারণ হতে পারে। এক পায়ে দাঁড়ানোর অনুশীলন শরীরের ভারসাম্য উন্নত করে এবং প্রতিক্রিয়া জানানোর গতি বাড়ায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক সময় পড়ে যাওয়ার পেছনে শক্তির অভাব নয়, বরং দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে না পারাটাই বড় কারণ। এই অনুশীলন সেই ঘাটতি পূরণে সহায়তা করে।
. পেশি শক্তিশালী করে, সারকোপেনিয়ার ঝুঁকি কমায়
৩০ বছরের পর থেকেই আমাদের শরীরের পেশির ভর ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে, যাকে বলা হয় সারকোপেনিয়া। প্রতি ১০ বছরে প্রায় ৮ শতাংশ পর্যন্ত পেশি কমে যেতে পারে, আর ৮০ বছর বয়সে পৌঁছালে প্রায় অর্ধেক মানুষের ক্ষেত্রে এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এক পায়ে দাঁড়ানোর মতো সহজ ব্যায়াম পা, নিতম্ব ও কোমরের পেশিকে সক্রিয় রাখে। ফলে ভবিষ্যতে পেশিক্ষয়ের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়।
৩. মস্তিষ্কের কার্যকারিতা ও স্মৃতিশক্তি উন্নত করে
এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা শুধু পেশির খেলা নয়, এটি পুরোপুরি একটি ‘মস্তিষ্ক-নিয়ন্ত্রিত’ কাজ। চোখ, কানের ভেস্টিবুলার সিস্টেম (ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ) এবং শরীরের স্নায়ুতন্ত্র—সবকিছুর সমন্বয়ে আমরা ভারসাম্য ধরে রাখি। এই প্রক্রিয়ায় মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ যেমন প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স সক্রিয় হয়। ফলে নিয়মিত চর্চা স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ এবং তথ্য প্রক্রিয়াকরণের ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
৪. অকাল মৃত্যুঝুঁকির ইঙ্গিত দিতে পারে
শুনতে অদ্ভুত লাগলেও, এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার সক্ষমতার সঙ্গে অকাল মৃত্যুঝুঁকির একটি সম্পর্ক রয়েছে। ২০২২ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা মধ্যবয়সে এক পায়ে ১০ সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না, তাদের পরবর্তী কয়েক বছরে মৃত্যুঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি। অন্যদিকে যারা সহজে এই ভারসাম্য ধরে রাখতে পারেন, তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কম এবং দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতার সম্ভাবনা বেশি।
৫. ডিমেনশিয়া ও আলঝেইমারের ঝুঁকি ধীর করে
যাদের ভারসাম্য ধরে রাখার ক্ষমতা ভালো, তাদের ক্ষেত্রে স্মৃতিভ্রম বা ডিমেনশিয়ার অগ্রগতি ধীরগতির হয়, এমনটাই জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে, যারা এক পায়ে কয়েক সেকেন্ডও দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না, তাদের মধ্যে জ্ঞানীয় অবক্ষয় দ্রুত দেখা দেওয়ার প্রবণতা বেশি। অর্থাৎ, এই ছোট্ট অনুশীলনটি মস্তিষ্কের দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কীভাবে শুরু করবেন?
ভালো খবর হলো, এই ব্যায়ামটি খুব সহজ এবং দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গেই যুক্ত করা যায়।
১. দাঁত ব্রাশ করার সময় ১০ সেকেন্ড এক পায়ে দাঁড়ান, তারপর পা বদলান
২. থালা-বাসন ধোয়ার সময়ও এটি চর্চা করতে পারেন
৩. খালি পায়ে এবং জুতা পরে দুইভাবেই অনুশীলন করলে ভারসাম্য আরও উন্নত হয়
৪. প্রথমে দেয়াল বা কোনো কিছুর সহায়তা নিতে পারেন। ধীরে ধীরে চেষ্টা করুন কম দুলে বেশি সময় দাঁড়িয়ে থাকতে।
শেষ কথা
এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা, এই ছোট্ট অভ্যাসটিই হতে পারে সুস্থ বার্ধক্যের বড় চাবিকাঠি। নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে ৯০ বছর বয়সেও ভালো ভারসাম্য ধরে রাখা সম্ভব, এমন উদাহরণও রয়েছে। তাই আজ থেকেই শুরু হোক চর্চা। দিনে মাত্র কয়েক মিনিট সময় দিলেই শরীর ও মস্তিষ্ক দুটোই থাকবে আরও সক্রিয়, আরও সুস্থ।
সূত্র : বিবিসি বাংলা
মন্তব্য করুন