মহাকাশের ক্যাপ্টেন থেকে এক্স-মেনের প্রফেসর, চিরবিদায় কিংবদন্তি প্যাট্রিক স্টুয়ার্টের
শৈশবের দারিদ্র্য আর পারিবারিক অশান্তি পেরিয়ে শেক্সপিয়ারের মঞ্চ থেকে হলিউডের শীর্ষে পৌঁছেছিলেন তিনি। জীবনের শেষ প্রান্তেও অভিনয় থেকে সরে যাননি। ৮৬ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যুতে শোকের ছায়া বিশ্ব বিনোদনজগতে।
মহাকাশযানের নিয়ন্ত্রণকক্ষে বসে দৃঢ় কণ্ঠে নির্দেশ দিচ্ছেন ক্যাপ্টেন জ্যাঁ-লুক পিকার্ড। আবার কখনো হুইলচেয়ারে বসে অতিমানবীয় ক্ষমতাসম্পন্ন একদল তরুণকে মানবতা, সহনশীলতা আর শান্তির শিক্ষা দিচ্ছেন প্রফেসর চার্লস জেভিয়ার। পর্দার এই দুই কিংবদন্তি চরিত্রের পেছনে ছিলেন একই মানুষ—ব্রিটিশ অভিনেতা স্যার প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট।
যাঁর কণ্ঠস্বর, ব্যক্তিত্ব আর অভিনয়ের গভীরতা কয়েক প্রজন্মের দর্শককে মুগ্ধ করেছে, সেই প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট আর নেই। বুধবার (২৮ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে নিজ বাসভবনে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর।
বৃহস্পতিবার পরিবারের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়। বিবৃতিতে জানানো হয়, জীবনের শেষ সময়ে তিনি আলঝেইমার রোগ ও লিউই বডি ডিমেনশিয়ায় ভুগছিলেন। মৃত্যুর সময় তাঁর পাশে ছিলেন স্ত্রী সানি ওজেল।
ছয় দশকের বেশি সময়ের অভিনয়জীবনে অসংখ্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন স্টুয়ার্ট। তবে বিশ্বজুড়ে কোটি দর্শকের কাছে তিনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন ‘স্টার ট্রেক’-এর ক্যাপ্টেন পিকার্ড এবং ‘এক্স-মেন’-এর প্রফেসর এক্স হিসেবে।
তাঁর মৃত্যু শুধু হলিউডের একজন জনপ্রিয় অভিনেতার বিদায় নয়, বরং মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি।
দারিদ্র্যের সংসার থেকে অভিনয়ের স্বপ্ন

১৯৪০ সালের ১৩ জুলাই ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ারের মিরফিল্ড শহরে জন্ম প্যাট্রিক স্টুয়ার্টের। সাধারণ শ্রমজীবী পরিবারে তাঁর বেড়ে ওঠা। শৈশব ছিল আর্থিক সংকট ও পারিবারিক অশান্তিতে ঘেরা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পর তাঁর বাবা মানসিক সমস্যায় ভুগতেন এবং মায়ের ওপর সহিংস আচরণ করতেন। ছোটবেলায় মাকে রক্ষা করতে বাবার সামনে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতাও হয়েছিল স্টুয়ার্টের।
পারিবারিক জীবনের এসব বেদনাদায়ক স্মৃতি পরবর্তী সময়ে তাঁর ব্যক্তিত্ব ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে গভীর প্রভাব ফেলে।
কিন্তু সেই কঠিন সময়েই জীবনের নতুন একটি পথ খুঁজে পান তিনি। মাত্র ১২ বছর বয়সে বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক তাঁকে উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের সাহিত্য ও নাটকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। বিশেষ করে ‘দ্য মার্চেন্ট অব ভেনিস’ নাটক তাঁর মনে গভীর ছাপ ফেলে।
অভিনয় তখন তাঁর কাছে শুধু বিনোদন ছিল না; হয়ে উঠেছিল পারিবারিক অস্থিরতা থেকে মানসিক আশ্রয় খুঁজে পাওয়ার একটি মাধ্যম।
কৈশোরেই স্থানীয় নাট্যদলের সঙ্গে যুক্ত হন। পরবর্তী সময়ে বৃত্তি নিয়ে ব্রিস্টল ওল্ড ভিক থিয়েটার স্কুলে অভিনয়ের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
অভিনয়ের প্রতি একাগ্রতা ও অসাধারণ কণ্ঠস্বর তাঁকে ধীরে ধীরে ব্রিটিশ নাট্যজগতের পরিচিত মুখে পরিণত করে।
শেক্সপিয়ারের মঞ্চে তৈরি হয়েছিল যে কিংবদন্তি

প্যাট্রিক স্টুয়ার্টের অভিনয়জীবনের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল মঞ্চনাটকে। ষাটের দশকে তিনি যুক্ত হন ব্রিটেনের ঐতিহ্যবাহী রয়্যাল শেক্সপিয়ার কোম্পানিতে।
সেখানে দীর্ঘ সময় অভিনয় করেন শেক্সপিয়ারের অসংখ্য কালজয়ী চরিত্রে। ‘হ্যামলেট’, ‘অ্যান্টনি অ্যান্ড ক্লিওপেট্রা’সহ বিভিন্ন নাটকে তাঁর অভিনয় দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা অর্জন করে।
মঞ্চে কাজ করার সময় তিনি শিখেছিলেন সংলাপের প্রতিটি শব্দকে কীভাবে জীবন্ত করে তুলতে হয়। শারীরিক উপস্থিতি, কণ্ঠস্বরের ওঠানামা এবং আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করার অসাধারণ দক্ষতা তাঁর অভিনয়কে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।
এই মঞ্চাভিজ্ঞতাই পরবর্তী সময়ে চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনে তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে ওঠে।
ব্রিটিশ মঞ্চনাটকে প্রতিষ্ঠা পেলেও তখনো তিনি আন্তর্জাতিক তারকা নন। জীবনের প্রায় অর্ধেক সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর তাঁর সামনে আসে এমন একটি সুযোগ, যা বদলে দেয় সবকিছু।
৪৭ বছর বয়সে এল বিশ্বজোড়া খ্যাতি

১৯৮৭ সাল। প্যাট্রিক স্টুয়ার্টের বয়স তখন ৪৭ বছর। মার্কিন বিজ্ঞান কল্পকাহিনিনির্ভর টেলিভিশন সিরিজ ‘স্টার ট্রেক: দ্য নেক্সট জেনারেশন’-এ ক্যাপ্টেন জ্যাঁ-লুক পিকার্ড চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব পান তিনি।
শুরুতে এই চরিত্রে কাজ করা নিয়ে সংশয়ে ছিলেন স্টুয়ার্ট। দীর্ঘদিনের বন্ধু ও সহ-অভিনেতা ইয়ান ম্যাককেলেনও তাঁকে সতর্ক করেছিলেন, হলিউডের বিজ্ঞান কল্পকাহিনিনির্ভর সিরিজে যুক্ত হলে ব্রিটিশ মঞ্চনাটকের ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঝুঁকি নেন স্টুয়ার্ট।
আর সেই সিদ্ধান্তই তাঁকে নিয়ে যায় আন্তর্জাতিক খ্যাতির শীর্ষে।
১৯৮৭ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত সাত মৌসুমে প্রচারিত ‘স্টার ট্রেক: দ্য নেক্সট জেনারেশন’-এর ১৭৬টি পর্বে ক্যাপ্টেন পিকার্ডের ভূমিকায় অভিনয় করেন তিনি।
পিকার্ড ছিলেন এমন একজন মহাকাশযানের অধিনায়ক, যিনি শুধু শক্তি প্রদর্শন নয়, যুক্তি, নৈতিকতা, কূটনীতি ও মানবিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দিতেন।
তাঁর নেতৃত্বে কাল্পনিক মহাকাশযান ইউএসএস এন্টারপ্রাইজ ছুটে বেড়িয়েছে মহাবিশ্বের অজানা প্রান্তে। কিন্তু সিরিজটির আবেদন শুধু মহাকাশ অভিযানেই সীমাবদ্ধ ছিল না। যুদ্ধ, শান্তি, সভ্যতা, বৈচিত্র্য এবং মানবতার ভবিষ্যৎ নিয়েও নানা প্রশ্ন তুলে ধরেছিল এটি।
স্টুয়ার্টের সংযত ও গভীর অভিনয় ক্যাপ্টেন পিকার্ডকে বিজ্ঞান কল্পকাহিনির অন্যতম স্মরণীয় চরিত্রে পরিণত করে।
পরবর্তী সময়ে ‘স্টার ট্রেক’-এর একাধিক চলচ্চিত্রেও একই চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। এমনকি ২০২০ সালে, প্রায় আট দশক বয়সেও ‘স্টার ট্রেক: পিকার্ড’ সিরিজের মাধ্যমে আবার ফিরে আসেন দর্শকের প্রিয় সেই চরিত্রে। সিরিজটি চলে ২০২৩ সাল পর্যন্ত।
এক্স-মেনের প্রফেসর এক্স: নতুন প্রজন্মের কাছে নতুন পরিচয়

ক্যাপ্টেন পিকার্ড চরিত্রে বিশ্বখ্যাতি পাওয়ার পর প্যাট্রিক স্টুয়ার্টের সামনে আসে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
২০০০ সালে মুক্তি পায় মার্ভেল কমিকসের চরিত্র অবলম্বনে নির্মিত সুপারহিরো চলচ্চিত্র ‘এক্স-মেন’। এতে প্রফেসর চার্লস জেভিয়ার চরিত্রে অভিনয় করেন স্টুয়ার্ট।
চলচ্চিত্রে চার্লস জেভিয়ার এমন এক শিক্ষক ও পথপ্রদর্শক, যিনি অতিমানবীয় ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষদের সমাজে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের স্বপ্ন দেখান।
অন্যদিকে তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধু ম্যাগনেটো বিশ্বাস করেন ভিন্ন এক আদর্শে। এই দুই চরিত্রের দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রে উঠে আসে বৈষম্য, ক্ষমতা, সহনশীলতা এবং মানবিকতার প্রশ্ন।
বাস্তবজীবনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ইয়ান ম্যাককেলেনই পর্দায় ম্যাগনেটো চরিত্রে অভিনয় করেন।
প্রফেসর এক্স চরিত্রে স্টুয়ার্টের অভিনয় এতটাই জনপ্রিয় হয় যে পরবর্তী দুই দশকের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন ‘এক্স-মেন’ চলচ্চিত্রে তাঁকে দেখা যায়।
বিশেষ করে ২০১৭ সালে মুক্তি পাওয়া ‘লোগান’ চলচ্চিত্রে বার্ধক্য ও শারীরিক দুর্বলতার সঙ্গে লড়াই করা চার্লস জেভিয়ার চরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকের মনে গভীর ছাপ ফেলে।
এখানে তিনি কেবল একজন শক্তিশালী অতিমানব নন, বরং বয়সের ভারে নুয়ে পড়া, স্মৃতির সমস্যায় আক্রান্ত এবং মানবিক দুর্বলতায় পরিপূর্ণ একজন মানুষকে তুলে ধরেন।
২০২২ সালে ‘ডক্টর স্ট্রেঞ্জ ইন দ্য মাল্টিভার্স অব ম্যাডনেস’ চলচ্চিত্রেও বিশেষ উপস্থিতিতে আবার চার্লস জেভিয়ার হিসেবে দেখা যায় তাঁকে।
মৃত্যুর পরও বড় পর্দায় দেখা যাবে প্যাট্রিক স্টুয়ার্টকে
অভিনয় থেকে পুরোপুরি অবসর নেওয়ার পরিবর্তে জীবনের শেষ পর্যায় পর্যন্ত কাজ করে গেছেন প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট।
মার্ভেলের বহুল প্রতীক্ষিত চলচ্চিত্র ‘অ্যাভেঞ্জার্স: ডুমসডে’-তেও অভিনয় করেছেন তিনি।
চলচ্চিত্রটি ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে মুক্তির পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে মৃত্যুর পরও বড় পর্দায় দর্শকেরা আবার দেখতে পাবেন প্রিয় এই অভিনেতাকে।
দীর্ঘ অভিনয়জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও নতুন প্রজন্মের জনপ্রিয় সুপারহিরো চলচ্চিত্রে তাঁর উপস্থিতি প্রমাণ করে, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেকে কতটা প্রাসঙ্গিক রাখতে পেরেছিলেন তিনি।
পর্দার বাইরেও ছিলেন মানবিক এক মানুষ
প্যাট্রিক স্টুয়ার্টের জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় ছিল তাঁর মানবিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড।
শৈশবে মায়ের ওপর পারিবারিক সহিংসতার অভিজ্ঞতা তাঁকে পরবর্তী সময়ে সহিংসতার শিকার নারী ও শিশুদের পাশে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করে।
তিনি পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে কাজ করা ব্রিটিশ দাতব্য সংস্থা ‘রিফিউজ’-এর কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নিজের জীবনের কষ্টকর অভিজ্ঞতা প্রকাশ করে সমাজে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করেছেন।
অভিনেতা হিসেবে খ্যাতি পাওয়ার পরও সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম ও সামাজিক সমস্যার প্রতি তাঁর আগ্রহ অটুট ছিল।
তাঁর জীবন থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—ব্যক্তিগত দুঃখ, সংকট কিংবা সীমাবদ্ধতা মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দেয় না। সংকটকে অতিক্রম করেও একজন মানুষ নিজের স্বপ্ন পূরণের পাশাপাশি অন্যের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব রাখতে পারেন।
সম্মাননা ও স্বীকৃতিতে সমৃদ্ধ দীর্ঘ ক্যারিয়ার
শুধু জনপ্রিয়তার বিচারে নয়, অভিনয়শিল্পী হিসেবেও অসংখ্য স্বীকৃতি অর্জন করেছেন প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট।
ব্রিটিশ মঞ্চে তাঁর অভিনয় তাঁকে এনে দেয় মর্যাদাপূর্ণ লরেন্স অলিভিয়ের পুরস্কার। ১৯৭৯ সালে ‘অ্যান্টনি অ্যান্ড ক্লিওপেট্রা’ এবং ২০০৯ সালে ‘হ্যামলেট’-এ অভিনয়ের জন্য এ সম্মান অর্জন করেন তিনি।
এ ছাড়া কণ্ঠশিল্পী হিসেবে তাঁর অসাধারণ দক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৬ সালে ‘পিটার অ্যান্ড দ্য উলফ’-এর বর্ণনার জন্য গ্র্যামি পুরস্কারও পান।
২০১০ সালে নাট্যকলায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ তাঁকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করেন। এরপর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর নামের আগে যুক্ত হয় ‘স্যার’।
২০২৩ সালে প্রকাশিত আত্মজীবনী ‘মেকিং ইট সো’-তে নিজের শৈশব, সংগ্রাম, অভিনয়জীবন এবং বিখ্যাত চরিত্রগুলোর সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের নানা দিক তুলে ধরেন তিনি।
হলিউডজুড়ে শোক, স্মৃতিচারণায় সহশিল্পীরা
প্যাট্রিক স্টুয়ার্টের মৃত্যুতে হলিউডসহ আন্তর্জাতিক বিনোদনজগতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধু ও ‘এক্স-মেন’ সহশিল্পী ইয়ান ম্যাককেলেন স্মৃতিচারণায় স্টুয়ার্টের সততা, ব্যক্তিত্ব এবং বন্ধুত্বের কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, স্টুয়ার্ট ছিলেন নিজের প্রজন্মের সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় ও ভালোবাসার অভিনয়শিল্পীদের একজন।
‘এক্স-মেন’ সিরিজে উলভারিন চরিত্রে অভিনয় করা হিউ জ্যাকম্যানও গভীর শোক জানিয়েছেন। তিনি স্টুয়ার্টকে মঞ্চ ও পর্দার অন্যতম সেরা অভিনয়শিল্পী এবং নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু হিসেবে স্মরণ করেছেন।
‘স্টার ট্রেক’ তারকা উইলিয়াম শ্যাটনার স্মরণ করেছেন স্টুয়ার্টের প্রজ্ঞা, সৌজন্য এবং মানবিক গুণাবলির কথা।
মার্ভেল স্টুডিওসের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে শ্রদ্ধা। প্রতিষ্ঠানটির মতে, চার্লস জেভিয়ার চরিত্রটিকে কয়েক প্রজন্মের দর্শকের কাছে স্মরণীয় করে তুলেছিলেন স্টুয়ার্ট।
শুধু সহশিল্পীরাই নন, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ভক্তরাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর অভিনীত চরিত্র, সংলাপ ও স্মরণীয় মুহূর্তগুলো শেয়ার করে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন।
শেষ অধ্যায়, কিন্তু শেষ নয় তাঁর উত্তরাধিকার

প্যাট্রিক স্টুয়ার্টের ব্যক্তিগত জীবনেও ছিল নানা উত্থান-পতন। তিনি তিনবার বিয়ে করেন। তাঁর তৃতীয় স্ত্রী সংগীতশিল্পী সানি ওজেল। আগের সংসারে তাঁর দুই সন্তান ড্যানিয়েল ও সোফি।
জীবনের শেষ সময়ে স্ত্রী, পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনদের সান্নিধ্যে ছিলেন এই অভিনেতা।
তাঁর জীবনের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক সম্ভবত এই যে, অধিকাংশ শিল্পী যখন তুলনামূলক কম বয়সে তারকাখ্যাতির স্বপ্ন দেখেন, স্টুয়ার্ট তখন ৪৭ বছর বয়সে এসে পান বিশ্বব্যাপী পরিচিতি।
এরপর আরও প্রায় চার দশক ধরে অভিনয় করে গেছেন। বয়স বাড়লেও দর্শকের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা কমেনি; বরং নতুন নতুন প্রজন্মের কাছে আরও বিস্তৃত হয়েছে।
একদিকে শেক্সপিয়ারের নাটকের গম্ভীর চরিত্র, অন্যদিকে মহাকাশ অভিযানের বুদ্ধিদীপ্ত অধিনায়ক; কখনো অতিমানবদের শিক্ষক, কখনো অসহায় এক বৃদ্ধ—প্রতিটি চরিত্রেই নিজের অভিনয়প্রতিভার স্বতন্ত্র ছাপ রেখে গেছেন তিনি।
তাঁর মৃত্যু চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। কিন্তু তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলো আজও দর্শকের কল্পনা, স্মৃতি ও ভালোবাসায় জীবন্ত।
মহাকাশযানের ক্যাপ্টেন পিকার্ড হয়তো আর নতুন অভিযানে নেতৃত্ব দেবেন না। প্রফেসর চার্লস জেভিয়ারও আর নতুন করে অতিমানবদের ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখাবেন না।
তবু প্যাট্রিক স্টুয়ার্টের কণ্ঠস্বর, সংলাপ এবং পর্দায় তাঁর অসাধারণ উপস্থিতি বারবার মনে করিয়ে দেবে—একজন সত্যিকারের শিল্পীর জীবন শেষ হলেও তাঁর সৃষ্টি থেকে যায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম।
মঞ্চ থেকে মহাকাশ, মহাকাশ থেকে সুপারহিরোর জগৎ—সবখানেই নিজের অমর স্বাক্ষর রেখে বিদায় নিলেন স্যার প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট।
মন্তব্য করুন