ঠাকুরগাঁও-১ আসনের আসন্ন উপনির্বাচন ঘিরে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। নির্বাচনে অনিয়ম ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ তুলে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে সতর্ক করে বলেছেন, ১৯৯৪ সালের বিতর্কিত মাগুরা উপনির্বাচনের মতো পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি যেন ঠাকুরগাঁওয়ে না ঘটে।
রোববার (২৫ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের কাছে এসব কথা বলেন তিনি।
গোলাম পরওয়ার জানান, ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে প্রশাসনিক পক্ষপাত, নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন, ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং জামায়াতের নেতাকর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব বিষয়ে সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহ করে সুনির্দিষ্ট ৯টি অভিযোগ প্রমাণসহ নির্বাচন কমিশনের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।
মাগুরার নির্বাচনের ইতিহাস মনে করিয়ে দিলেন পরওয়ার
১৯৯৪ সালের মাগুরা উপনির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, তৎকালীন বিএনপি সরকারের আমলে ওই নির্বাচন ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকট এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে রাজনৈতিক আন্দোলন আরও জোরালো হয়ে ওঠে।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, একটি বিতর্কিত নির্বাচন কখনো কখনো পুরো রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। তাই ঠাকুরগাঁওয়ের উপনির্বাচন যেন অতীতের মতো নতুন কোনো সংকট সৃষ্টি না করে, সে বিষয়ে সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
ইউএনওর বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খায়রুল ইসলামের বিরুদ্ধে সরাসরি বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার অভিযোগ তুলেছে জামায়াত।
গোলাম পরওয়ারের দাবি, ওই কর্মকর্তা নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করছেন এবং বিএনপি প্রার্থীর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। এমনকি আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার অভিযোগও কমিশনের কাছে তুলে ধরা হয়েছে।
এসব অভিযোগ তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তাঁকে নির্বাচনী দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে দলটি।
ভোটারদের হুমকি ও সংখ্যালঘুদের মধ্যে আতঙ্কের অভিযোগ
নির্বাচনী এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটার ও সরকারি চাকরিজীবীদের ওপর রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের অভিযোগও করেছেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল।
তিনি দাবি করেন, ঠাকুরগাঁও-১ আসনে প্রায় ১ লাখ ৬৮ হাজার হিন্দু ভোটার রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে সরকারি চাকরিজীবী ও শিক্ষকের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। জামায়াতের অভিযোগ, দাঁড়িপাল্লার পক্ষে অবস্থান নিলে চাকরি ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে সমস্যায় পড়তে হতে পারে—এমন ভয় দেখানো হচ্ছে কিছু ভোটারকে।
এ ধরনের পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভোটাররা নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবেন কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
পাশাপাশি জামায়াতের নারী ও পুরুষ নেতাকর্মীদের ওপর হামলা, নির্বাচনী প্রচারে বাধা এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগও কমিশনের নজরে আনা হয়েছে। হামলায় জড়িত বলে অভিযোগ ওঠা ব্যক্তিদের ছবি ও অন্যান্য তথ্য জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানান গোলাম পরওয়ার।
নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের একাধিক অভিযোগ
জামায়াতের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, বিএনপি প্রার্থীর নির্বাচনী প্রচারে বিভিন্নভাবে আচরণবিধি লঙ্ঘিত হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের আগে মাইক ব্যবহার, রঙিন নির্বাচনী প্রতীক প্রদর্শন, মসজিদের ভেতরে নির্বাচনী সভা এবং সরকারি চিকিৎসকদের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা দিয়ে ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে বলে দাবি করেছে দলটি।
এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং নির্বাচনী পরিবেশে সব প্রার্থীর সমান সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে জামায়াত।
সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি
উপনির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ করতে পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি জানিয়েছেন গোলাম পরওয়ার।
তাঁর মতে, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তাতে কেবল পুলিশের ওপর নির্ভর করে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা কঠিন হবে।
তিনি অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক চাপের মুখে নির্বাচন কমিশন তার সাংবিধানিক ক্ষমতা যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে পারছে না। কমিশনকে আরও স্বাধীন ও কার্যকর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।
বৈঠকে কমিশনের কাছে তিনটি প্রধান দাবি তুলে ধরা হয়। এগুলো হলো—উত্থাপিত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণ, নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা।
নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়নি জামায়াত
উপনির্বাচনে জামায়াতের অংশগ্রহণ নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে গোলাম পরওয়ার জানান, দলটি এখনো নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
তিনি বলেন, জামায়াত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চায় এবং দলের প্রার্থী মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। তবে ভোটারদের নিরাপত্তা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং সবার জন্য সমান নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
জামায়াতের দাবি অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন অভিযোগগুলো পর্যালোচনার কথা জানিয়েছে। তবে কমিশনের বক্তব্যে পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারেননি দলটির নেতারা।
উল্লেখ্য, আগামী ২৯ অক্টোবর ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ভোটের মাত্র কয়েক দিন আগে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে জামায়াতের এসব অভিযোগ নতুন করে নির্বাচনী পরিবেশের বিষয়টি আলোচনায় এনেছে।
তবে জামায়াতের উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে বৈঠকে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মোবারক হোসাইনসহ দলটির জ্যেষ্ঠ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
মন্তব্য করুন