সিয়েরা লিওন থেকে হাইতি, দক্ষিণ সুদান থেকে কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতকবলিত অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা ও মানবিক সহায়তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা।
জাতিসংঘের পতাকার পাশে লাল-সবুজের পতাকা বহন করে তাঁরা ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে নিরাপত্তা কার্যক্রমের পাশাপাশি চিকিৎসাসেবা, ওষুধ বিতরণ, প্রকৌশল সহায়তা ও অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ করছেন।
তাঁদের এসব মানবিক উদ্যোগ স্থানীয় জনগণের আস্থা অর্জনেও ভূমিকা রাখছে।
জাতিসংঘের দক্ষিণ সুদান মিশনের (ইউএনএমআইএসএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চে ওয়াউ এলাকায় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা চার শতাধিক বাস্তুচ্যুত মানুষকে বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা দেন।
চিকিৎসা ও ওষুধ পেতে সেখানে রোগীদের দীর্ঘ সারিতে অপেক্ষা করতে দেখা যায়।
এর আগে, ২০১৭ সালে একই এলাকায় আরেকটি চিকিৎসা কার্যক্রমে ম্যালেরিয়া, টাইফয়েড ও ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত তিন শতাধিক স্থানীয় বাসিন্দাকে চিকিৎসা দেন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা।
এসব উদ্যোগ প্রমাণ করে, শান্তিরক্ষা শুধু নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সংঘাতকবলিত মানুষের জরুরি প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানোও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
১৯৮৮ সালে ইরান-ইরাক সামরিক পর্যবেক্ষক দলে সদস্য পাঠানোর মধ্য দিয়ে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়।
১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীও এ কার্যক্রমে যুক্ত হয়।
এরপর থেকে আফ্রিকা, এশিয়া ও ক্যারিবীয় অঞ্চলসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন করেছেন বাংলাদেশের সদস্যরা।
সিয়েরা লিওন, হাইতি, লাইবেরিয়া, সোমালিয়া, কম্বোডিয়া, আইভরি কোস্ট, সুদান, দক্ষিণ সুদান ও কঙ্গোসহ বিভিন্ন দেশে তাঁদের অবদান রয়েছে।
সিয়েরা লিওনে গৃহযুদ্ধের পর শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা জাতিসংঘের উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ (এএফডি)-এর ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত জাতিসংঘের ৪৩টি শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের ৫ হাজার ৫৬৮ জন শান্তিরক্ষী নিয়োজিত রয়েছেন। এ ছাড়া, এ পর্যন্ত বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর মোট ১ হাজার ৯৭৭ জন নারী সদস্য জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন।
ওয়েবসাইটে বিভিন্ন শান্তিরক্ষা মিশনে বর্তমানে নিয়োজিত ২৮৮ জন নারী সামরিক সদস্যের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে সেনাবাহিনীর ২৭৪ জন, নৌবাহিনীর সাতজন এবং বিমানবাহিনীর সাতজন রয়েছেন। তবে, এসব তথ্য সর্বশেষ কবে হালনাগাদ করা হয়েছে, তা ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়নি।
অন্যদিকে, হাইতিতে বাংলাদেশ পুলিশের ১৬০ সদস্যের নারী পুলিশ ইউনিট ২০১৫ সাল থেকে ২০১৭ সালের অক্টোবর পর্যন্ত নিরাপত্তা কার্যক্রম, স্থানীয় জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ ও পুনর্গঠন-সংশ্লিষ্ট কাজে অবদান রাখেন।
সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের (এএফডি) ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর ১ হাজার ৯৭৭ জন নারী সদস্য এ পর্যন্ত জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নিয়েছেন।
বর্তমানে ২৮৮ জন নারী সামরিক সদস্য মোতায়েন রয়েছেন বলে ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে সেনাবাহিনীর ২৭৪ জন, নৌবাহিনীর সাতজন ও বিমানবাহিনীর সাতজন রয়েছেন। তবে তথ্যগুলোর সর্বশেষ হালনাগাদের তারিখ উল্লেখ নেই।
২০১৭ সালে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর দুই নারী কর্মকর্তা ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট নাইমা হক ও ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তামান্না-ই-লুৎফী কঙ্গোতে জাতিসংঘ মিশনে দায়িত্ব পালন করেন।
২০১৯ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী স্থানীয় নারী ও শিশুদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ চিহ্নিত করতে ব্যাটালিয়ন পর্যায়ে ফিমেল এনগেজমেন্ট টিম চালু করে।
শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অবদান এসেছে ত্যাগ ও আত্মোৎসর্গের বিনিময়ে। সংঘাতপূর্ণ এলাকায় দায়িত্ব পালনকালে বহু বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন।
তাঁদের পেশাদারিত্ব, সাহস ও মানবিক সেবা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মর্যাদা সুদৃঢ় করেছে।
সংঘাতবিধ্বস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে চিকিৎসা ও মানবিক সহায়তা দেওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁরা আস্থা ও সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তুলছেন।
বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের হাতে বহন করা লাল-সবুজের পতাকা তাই শুধু জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক নয়; এটি বিশ্বশান্তি, মানবিক সংহতি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় বাংলাদেশের অঙ্গীকারেরও প্রতিফলন।
মন্তব্য করুন