আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ফিলিস্তিনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস গাজায় অস্ত্র সমর্পণে সম্মতি দেওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বেশ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেও উল্টো সুর বাজছে ইসরায়েলে। ট্রাম্পের ঘোষিত ‘বোর্ড অব পিস’-এর মধ্যস্থতায় হওয়া এই চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত—গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং ক্রমান্বয়ে একটি ফিলিস্তিনি প্রশাসনের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর। তবে এই শর্ত ইসরায়েলি রাজনীতি ও সংবাদমাধ্যমে চরম অসন্তোষ ও অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে।
চুক্তির পর থেকে ইসরায়েল সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো কোনো বিবৃতি দেয়নি। তবে এক জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, গাজায় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অগ্রগতির কথা বলা হলেও ‘হামাসের চূড়ান্ত ও প্রকৃত নিরস্ত্রকরণ’ না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েল বর্তমান অবস্থান থেকে এক পা-ও পিছু হটবে না। অথচ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দাবি, এই চুক্তিতে ইসরায়েল “খুবই সন্তুষ্ট”।
ইসরায়েলি রাজনীতি ও ‘ইলেক্টোরাল সুইসাইড’
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের ঘটনার পর থেকে অধিকাংশ ইসরায়েলি গাজার ফিলিস্তিনিদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর মনোভাব পোষণ করে আসছেন। গত মে মাসে পরিচালিত এক জনমত সমীক্ষায় দেখা যায়, ৮২ শতাংশ ইহুদি-ইসরায়েলি গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বিতাড়নকে সমর্থন করে। এমনকি জুনের অন্য একটি জরিপে ৬৪ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, গাজার ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ‘কেউ নির্দোষ নয়’।
এমন পরিস্থিতিতে গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার এবং উপত্যকাটি পুনর্গঠনের যেকোনো উদ্যোগকে ইসরায়েলি কট্টরপন্থীরা চরম পরাজয় হিসেবে দেখছেন। ইসরায়েলের উগ্র ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির এই চুক্তিকে ‘একদমই গ্রহণযোগ্য নয়’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, “হামাস ঘাতকদের হত্যা বন্ধের প্রতিশ্রুতি দেওয়া মানে তাদের পরবর্তী গণহত্যার সুযোগ করে দেওয়া। গাজায় হামলা ও ফিলিস্তিনিদের দেশত্যাগে উৎসাহিত করার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে হবে।”
অন্যদিকে, বিরোধী ও মধ্যপন্থী নেতারাও চুক্তির তীব্র সমালোচনা করছেন। সাবেক সেনাপ্রধান ও আসন্ন নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোট বলেন, “হামাসের সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি ধ্বংস করা ছাড়া যেকোনো চুক্তিই সম্পূর্ণ ব্যর্থতা। ৭ অক্টোবরের প্রায় তিন বছর পার হতে চললেও হামাস তাদের আগের শক্তিতেই ফিরে এসেছে।”
নেতানিয়াহুর দ্বিধা ও রাজনৈতিক সমীকরণ
আগামী অক্টোবরে ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন সুতোয় ঝুলছে। বেশ কয়েকটি দুর্নীতি মামলায় দণ্ড এড়াতে হলে তাকে নির্বাচনে জয়ী হতেই হবে। কিন্তু সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে বিরোধী জোট অনেকখানি এগিয়ে রয়েছে।
মার্কিন-ইসরায়েলি রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডালিয়া শেইন্ডলিন মনে করেন, গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি নেতানিয়াহুর জন্য এই মুহূর্তে অসম্ভব। তবে একই সঙ্গে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকেও চটাতে চান না, কারণ নির্বাচনে ট্রাম্পের সমর্থন বা সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিককরণের ঘোষণা তার জয়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শেইন্ডলিনের মতে, নেতানিয়াহু হয়তো সেনা প্রত্যাহারের নামে একটি ‘প্রতীকী মহড়া’ চালাতে পারেন, যেমন—২০২৫ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তির নির্ধারিত সীমানায় সাময়িকভাবে সেনাদের সরিয়ে নেওয়া।
ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যে টানাপোড়েন
ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার অধ্যাপক দোভ ওয়াক্সম্যানের মতে, নেতানিয়াহু যদি চুক্তির প্রকাশ্যে সমালোচনা করেন, তবে ট্রাম্প মারাত্মক ক্ষুব্ধ হবেন। আর যদি চুক্তি মেনে নেন, তবে তার উগ্র ডানপন্থী জোট সরকার ভেঙে পড়বে।
ইসরায়েলি পলিসি ইনস্টিটিউট ‘মিতভিম’-এর প্রধান নিমাদ গোরেন বলেন, “নেতানিয়াহু প্রচার ও সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরার জন্য ট্রাম্পকে সব ধরনের আনুষ্ঠানিকতা ও চুক্তি স্বাক্ষরের সুযোগ দেবেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি গাজা থেকে সেনা সরাবেন না। তার মূল রাজনৈতিক আদর্শই হলো—ইসরায়েলের সীমান্ত ছাড়িয়ে সামরিক উপস্থিতি ধরে রাখা। নির্বাচনে জেতার জন্য তিনি গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহারের চেয়ে বরং যুদ্ধ আরো উসকে দেওয়ার পথই বেছে নিতে পারেন।”
সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনার শর্ত এবং ইসরায়েলি অভ্যন্তরীণ রাজনীতির দ্বন্দ্ব গাজা সংকটের সমাধানকে আবারও এক গভীর ধোঁয়াশার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে।
মন্তব্য করুন