নিউজ ডেস্ক
১ week আগে
অনলাইন সংস্করণ
পাঠক সংখ্যা ৬ জন

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য এক গভীর সংকেত

বিশ্বরাজনীতির ইতিহাস বারবার আমাদের সামনে এক কঠিন সত্য উন্মোচন করেছে; ভূগোল শুধু মানচিত্রের রেখা নয়, অনেক সময় সেটিই রাষ্ট্রের ভাগ্য নির্ধারণের নীরব নিয়ামক। মানচিত্রের একটি সরু জলরেখা কখনো কখনো সাম্রাজ্য গঠন করে, আবার কখনো সাম্রাজ্য ভেঙে দেয়। মধ্যপ্রাচ্যের বুকে অবস্থিত হরমুজ প্রণালি আজ এমনই এক ভূরাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু, যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে বিশ্ব অর্থনীতির একটি বড় অংশ। এ প্রণালিকে ঘিরে যখন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যকার সংঘাত সরাসরি সামরিক রূপ নিয়েছে, তখন তা শুধু আঞ্চলিক উত্তেজনা নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য এক গভীর সংকেত।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান এ যুদ্ধে পাল্টাপাল্টি হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ, সামরিক ঘাঁটি ধ্বংস এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে আঘাতের খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রতিনিয়ত উঠে আসছে। ইরানের ভেতরে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও শিল্প স্থাপনায় হামলার পাশাপাশি অঞ্চল জুড়ে মার্কিন উপস্থিতি লক্ষ্য করে আঘাত হানার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। একইভাবে ইসরায়েলের দিকে ইরানের ব্যাপক মিসাইল নিক্ষেপ পরিস্থিতিকে এক বহুমাত্রিক যুদ্ধে রূপ দিয়েছে। ফলে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা বহু বছর দেখা যায়নি।

এ উত্তেজনার কেন্দ্রে যখন হরমুজ প্রণালি, তখন এর তাৎপর্য বোঝা জরুরি। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়। বৈশ্বিক সমুদ্রপথে পরিবাহিত জ্বালানির একটি বড় অংশ এ প্রণালি অতিক্রম করে। ফলে এটি কার্যত বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের মহাসড়ক। ইরান যদি কৌশলগতভাবে এ প্রণালিতে বাধা সৃষ্টি করে বা বন্ধ ঘোষণা করে, তাহলে তা জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় তাৎক্ষণিক ও গভীর প্রভাব ফেলে।

ইরানের এ অবস্থান শুধু সামরিক কৌশল নয়; এটি একটি অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির মাধ্যম। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় এটি ‘চোক পয়েন্ট কন্ট্রোল’; অর্থাৎ গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলা। ইতিহাসে সুয়েজ খাল বা মালাক্কা প্রণালির গুরুত্ব যেমন ছিল, তেমনি আজ হরমুজ প্রণালিও একটি অর্থনৈতিক শক্তির প্রতীক। যুদ্ধের এ পর্যায়ে যখন সৌদি আরবের তেল শোধনাগারে হামলার খবর আসে এবং উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়, তখন বৈশ্বিক বাজারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

জ্বালানি বাজার শুধু সরবরাহ ও চাহিদার হিসাবেই চলে না; এটি প্রত্যাশা, ঝুঁকি ও মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়ার ওপরও নির্ভরশীল। যুদ্ধ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পায়। বীমা প্রিমিয়াম বেড়ে যায়, কারণ যুদ্ধাঞ্চল অতিক্রম করা জাহাজের ঝুঁকি বাড়ে। শিপিং খরচ বৃদ্ধি পায়। ফলস্বরূপ শিল্পপণ্যের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। এলএনজি বাজারেও অস্থিরতা দেখা দেয়, কারণ ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলো বিকল্প সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রতিযোগিতায় নামে।

বিশ্ব অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব বহুমাত্রিক। প্রথমত, তেলের দাম বৃদ্ধি সরাসরি পরিবহন খরচ বাড়ায়। পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়লে খাদ্যদ্রব্য থেকে শুরু করে নির্মাণসামগ্রী পর্যন্ত সবকিছুর দাম বৃদ্ধি পায়। দ্বিতীয়ত, বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানিনির্ভর দেশগুলোতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। তৃতীয়ত, শিল্পোৎপাদন ও রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতা কমে যায়। এর ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্যে মন্থরতা দেখা দিতে পারে।

মুদ্রাস্ফীতি এরই মধ্যে বহু দেশে উদ্বেগের বিষয়। জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি সেই চাপ আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়াতে বাধ্য হলে বিনিয়োগ কমে যেতে পারে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হতে পারে। একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অন্যদিকে নিম্ন প্রবৃদ্ধি—এ পরিস্থিতিকে অর্থনীতির ভাষায় ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ বলা হয়। ১৯৭০-এর দশকে তেল সংকটের সময় বিশ্ব অর্থনীতি এমন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়েছিল।

বর্তমান সংকট সেই ইতিহাসের প্রতিধ্বনি শোনাচ্ছে। ইউরোপীয় দেশগুলো, যারা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জ্বালানি সরবরাহে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করেছে, তারাও ব্যাপক চাপে পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব উৎপাদন বাড়িয়ে বাজারে স্থিতিশীলতা আনার চেষ্টা করতে পারে, কিন্তু বৈশ্বিক বাজারে আস্থার সংকট তৈরি হলে শুধু উৎপাদন বৃদ্ধিই যথেষ্ট হয় না। কারণ, আর্থিক বাজারে ভীতি ছড়িয়ে পড়লে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে সরে গিয়ে নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝোঁকে। স্বর্ণ ও ডলারের চাহিদা বেড়ে যায়। উদীয়মান অর্থনীতির মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ে।

চীন ও ভারত বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। এ সংকটে তারা বড় ধাক্কা খেতে পারে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেলে তাদের রপ্তানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতি বাড়বে। শিল্প খাতে মন্দা দেখা দিতে পারে। শেয়ারবাজারে অস্থিরতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এ চাপ তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর করতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতি দ্বিমুখী। একদিকে উচ্চ তেলের দাম তাদের রাজস্ব বাড়াতে পারে। অন্যদিকে যুদ্ধ ও অবকাঠামো ক্ষতির ঝুঁকি তাদের অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকে বিপর্যস্ত করতে পারে। বিনিয়োগ স্থগিত হতে পারে। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হলে বৈদেশিক বিনিয়োগ কমে যেতে পারে।

বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এ সংকট অত্যন্ত স্পর্শকাতর। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়বে। সরকারকে ভর্তুকি বৃদ্ধি করতে হলে বাজেট ঘাটতি বাড়বে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্য সমন্বয় করলে শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। পোশাক শিল্প, যা দেশের রপ্তানির প্রধান খাত, তা উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে।

পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পেলে নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে। খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানকে প্রভাবিত করবে। মুনাফার হার বৃদ্ধি পেলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা ঋণ গ্রহণে নিরুৎসাহিত হতে পারেন। কর্মসংস্থান সংকুচিত হতে পারে। অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি মন্থর হতে পারে।

প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও চাকরির স্থায়িত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হলে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যেতে পারে। তবে তেল রাজস্ব বৃদ্ধি পেলে কিছু দেশে অবকাঠামো প্রকল্প বাড়তে পারে, যা শ্রমবাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে সেই সম্ভাবনাও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।

এ সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জ্বালানি রূপান্তরের প্রশ্ন। উচ্চ তেলের দাম নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে উৎসাহিত করতে পারে। সৌর, বায়ু ও জলবিদ্যুৎ খাতে আগ্রহ বাড়তে পারে। বহু দেশ কৌশলগত মজুত বৃদ্ধি ও বিকল্প রুট উন্নয়নে মনোযোগ দিতে পারে। তবে স্বল্পমেয়াদে জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতির ওপর চাপ কমবে না।

ভূরাজনৈতিক দিক থেকে এ সংকট নতুন জোট ও সমীকরণ তৈরি করতে পারে। আঞ্চলিক শক্তিগুলো নিজেদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থরক্ষায় নতুন কৌশল গ্রহণ করতে পারে। কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়বে। জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সুতরাং বলা যায়, হরমুজ প্রণালি শুধু একটি ভৌগোলিক অবস্থান নয়; এটি বিশ্ব অর্থনীতির নাড়ি। এর প্রবাহ স্বাভাবিক থাকলে বিশ্ববাজার স্থিতিশীল থাকে আর এর অস্থিরতা বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক কম্পন সৃষ্টি করে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ সেই কম্পন তীব্র করে তুলেছে। বিশ্ব অর্থনীতির গতিপথ এখন নির্ভর করছে সংঘাতের স্থায়িত্ব, কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা এবং জ্বালানি নীতির পুনর্বিন্যাসের ওপর। যদি দ্রুত উত্তেজনা প্রশমিত না হয়, তবে এর প্রভাব শিল্পোন্নত দেশ থেকে শুরু করে উন্নয়নশীল অর্থনীতি পর্যন্ত সবখানে অনুভূত হবে, কারখানার উৎপাদন লাইনে, শেয়ারবাজারের সূচকে, এমনকি সাধারণ মানুষের রান্নাঘরের চুলায়ও। হরমুজের জলরেখা তাই আজ শুধু সমুদ্রের স্রোত নয়; এটি বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যতের স্রোতধারা।

লেখক: এমফিল গবেষক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সুনামগঞ্জে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মহাবারুণী শুরু

দেশে সপ্তাহব্যাপী ঈদের ছুটি শুরু

টানা ৪০ দিন জামাতে নামাজ পড়ে পুরস্কার পেল ২৯ কিশোর-যুবক

‘ঢাবিয়ান ফোরাম-নেত্রকোণা’র ইফতার

প্রধানমন্ত্রীর ২৮ দিনের ২৮ পদক্ষেপ, এক অভূতপূর্ব কর্মযজ্ঞ: মাহদী আমিন

তেহরান ও বৈরুতে ব্যাপক হামলা শুরু করার কথা জানালো ইসরাইলি সেনাবাহিনী

বাগদাদে মার্কিন দূতাবাসে ড্রোন ও রকেট হামলা, পৃথক হামলায় নিহত ৪

প্রধানমন্ত্রীর ‘পিএস’ পরিচয়ে প্রতারণা, গ্রেপ্তার আব্দুস সালাম

ইবাদতে কাটিয়েছেন শবেকদর ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা

রংপুরে সার কেলেঙ্কারি: বিএডিসি কর্মকর্তাসহ গ্রেপ্তার ৪

১০

বৈরুতের ৩টি এলাকায় বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইল: লেবাননের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম

১১

অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আর্জেন্টিনার সাবেক গোলরক্ষক সের্হিয়ো রোমেরো

১২

মোংলা বন্দরের দুই হাজার শ্রমিককে খাদ্য সহায়তা

১৩

দাম বেড়েছে নির্মাণ সামগ্রীর

১৪

খাল খননে সেচ সুবিধা বাড়বে, কৃষির উৎপাদন খরচ কমবে : বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী

১৫

অপরাধ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

১৬

বিআইডব্লিউটিসির নতুন তিনটি জাহাজ উদ্বোধন করলেন নৌপরিবহন মন্ত্রী

১৭

চম্পাতলী খাল খননে চাষাবাদের আওতায় আসবে দেড় হাজার বিঘা জমি : বাণিজ্য মন্ত্রী

১৮

কালীগঞ্জে যুব উন্নয়ন ও সমাজ কল্যাণ সংস্থার ঈদ উপহার বিতরণ

১৯

রাজশাহীতে ঈদকে ঘিরে বিপদের সংকেত

২০