আন্তর্জাতিক ডেস্ক | লিড নিউজ ২৪
স্কুলশিক্ষার্থীদের চলমান বিক্ষোভে পুলিশের ব্যবহৃত স্টান গ্রেনেডে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরের হাত হারানোর ঘটনার পর ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে ফ্রান্স সরকার। পরিস্থিতি সামাল দিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে পুলিশের স্টান গ্রেনেড ব্যবহার সাময়িকভাবে স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ।
বুধবার ফরাসি সংবাদমাধ্যম আরটিএল রেডিওকে নুনেজ জানান, উত্তর ফ্রান্সের লঁস শহরে বিক্ষোভ চলাকালে এক কিশোর গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনার প্রকৃত কারণ স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত হাইস্কুল শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে স্টান গ্রেনেড ব্যবহার বন্ধ থাকবে।
সোমবারের ওই ঘটনায় ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীর একটি হাত এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় যে পরে তা কেটে ফেলতে হয়। তবে ঠিক কীভাবে বিস্ফোরণ ঘটেছে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত তথ্য দেয়নি কর্তৃপক্ষ। আহত কিশোর গ্রেনেডটি হাতে তুলে নিয়েছিল, নাকি পুলিশের ছোড়া গ্রেনেড সরাসরি তার কাছে বিস্ফোরিত হয়েছিল—তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। কিশোরটির পরিবার দাবি করেছে, সে গ্রেনেডটি হাতে তুলে নেয়নি।
শিক্ষাব্যবস্থার নানা সংকটকে কেন্দ্র করে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ফ্রান্সজুড়ে আন্দোলন করছেন স্কুলশিক্ষার্থীরা। শিক্ষকসংকট, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী নিয়ে ক্লাস পরিচালনা, জরাজীর্ণ স্কুল ভবন এবং দীর্ঘ সময় ধরে চলা স্কুল কার্যক্রমসহ বিভিন্ন সমস্যার সমাধান দাবি করছেন তারা।
আন্দোলন ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ায় শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক, অভিভাবক ও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের সদস্যরাও বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন। মঙ্গলবার দেশটির বিভিন্ন শহরে বড় ধরনের কর্মসূচি পালিত হয়। সরকারি হিসাবে প্রায় দুই লাখ মানুষ বিভিন্ন শহরের মিছিলে অংশ নেন এবং প্যারিসে আরও প্রায় ৫৬ হাজার মানুষ বিক্ষোভে যোগ দেন।
অধিকাংশ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ থাকলেও কয়েকটি এলাকায় বিক্ষোভকারী ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। কোথাও কোথাও ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, লাঠিচার্জসহ দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন সরঞ্জাম ব্যবহার করেছে।
চলমান আন্দোলনে এখন পর্যন্ত অন্তত ২১৫ কিশোর-কিশোরী ও ৮৫ জন স্কুলকর্মী আহত হয়েছেন। একই সময়ে কয়েকশ পুলিশ সদস্যও আহত হয়েছেন। বিক্ষোভ ও সহিংসতার ঘটনায় কয়েক হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের বড় অংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক।
এদিকে পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগও ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। এক শিক্ষার্থীর হাত হারানোর পাশাপাশি অন্য ঘটনায় এক তরুণের চোখের দৃষ্টিশক্তি হারানো এবং আরেক শিক্ষার্থীর দাঁত ও চোয়াল গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
এসব ঘটনার পর পুলিশের আচরণ নিয়ে একাধিক অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করেছে ফরাসি কর্তৃপক্ষ। মানবাধিকার সংগঠন ও বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়নও বিক্ষোভ দমনে পুলিশের শক্তি প্রয়োগের মাত্রা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজের দাবি, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুলিশ পরিস্থিতি অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করেছে। একই সঙ্গে কোথাও অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলপ্রয়োগের অভিযোগ পাওয়া গেলে তা তদন্ত করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে বুধবার ফ্রান্সের শত শত হাইস্কুলে শিক্ষা কার্যক্রম পুরোপুরি অথবা আংশিকভাবে বন্ধ ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে। প্যারিসের সায়েন্সেস পোসহ কয়েক ডজন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের অবরোধের খবর পাওয়া গেছে।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এমন এক সময়ে তীব্র হয়েছে, যখন ফ্রান্স সরকার বাজেট ঘাটতি ও ক্রমবর্ধমান ঋণ সামাল দিতে আর্থিক চাপের মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যেই শিক্ষা খাতে আরও বিনিয়োগ এবং শিক্ষকসংকট সমাধানের দাবি সরকারের ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে।
ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু বিক্ষোভে সহিংসতার নিন্দা জানালেও শিক্ষার্থীদের মূল দাবিগুলো নিয়ে সরকার কাজ করবে বলে জানিয়েছেন। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ পরিস্থিতি নিয়ে শীর্ষ মন্ত্রীদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেছেন।
আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে শিক্ষার্থীদের এই দেশব্যাপী আন্দোলন এখন ফ্রান্সের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
মন্তব্য করুন