লিওনেল মেসির পুরোনো জাদু ফিরে পাওয়া থেকে শুরু করে দর্শকে পূর্ণ স্টেডিয়াম এবং স্পেনকে চমকে দেওয়া কেপ ভার্দের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স- এসবই ছিল বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ডের ম্যাচগুলোতে।
আজ থেকে শুরু হচ্ছে গ্রুপ পর্বের দ্বিতীয় রাউন্ডের ম্যাচ। প্রথম রাউন্ডের ম্যাচ শেষে যা জানা গেল :
মেসির জাদু এখনও অটুট
চার বছর আগে কাতার বিশ্বকাপে ট্রফি জিতে লিওনেল মেসির বিশ্বকাপ যাত্রার নিখুঁত সমাপ্তি ঘটেছিল। পুরো ফুটবল বিশ^ তেমনই ভেবেছিল।
কিন্তু ৩৯তম জন্মদিনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েও আর্জেন্টিনার অধিনায়ক ফুটবলের সবচেয়ে বড় পুরস্কারের জন্য আরেকবার চেষ্টা করার লোভ সামলাতে পারেননি। আর সেই চেষ্টায় তিনি কানসাস সিটিতে স্মরণীয় এক হ্যাটট্রিক উপহার দিয়েছেন।
আলজেরিয়ার বিপক্ষে মেসির তিনটি গোলের দুটি দুর্দান্ত শক্তিশালী শটে এবং একটি ছল সুযোগসন্ধানী ফিনিশ। এই তিন গোলের মাধ্যমে মেসি বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১৬ গোলের রেকর্ডধারী মিরোস্লাভ ক্লোজার রেকর্ডকে স্পর্শ করেছেন।
ফ্রান্সের ফরোয়ার্ড কিলিয়ান এমবাপ্পে এই রেকর্ড থেকে দুই গোল পিছিয়ে আছেন।
উচ্ছ্বসিত মেসি বলেন, “শেষ পর্যন্ত এটা শুধু একটি পরিসংখ্যান, এর বেশি কিছু নয়।”
সংখ্যা দিয়ে মেসির প্রতিভাকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়, তবে এগুলো এমন এক ফুটবলারের গল্প বলে যিনি এখনও বিশ্বমঞ্চে সবাইকে মুগ্ধ করে চলেছেন।
সোমবার অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে মেসির সামনে রেকর্ডটি এককভাবে নিজের করে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে, যা তাকে ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে আরও শক্ত অবস্থানে নিয়ে যাবে।
গোলহীন রোনাল্ডো
পর্তুগালের প্রথম ম্যাচে ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডো ছিলেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। যদিও প্রথম রাউন্ডে ফুটবলের আরও দুই বড় তারকা নিজেদের উজ্জ্বলভাবে মেলে ধরেছিলেন।
কিলিয়ান এমবাপ্পে ও আর্লিং হালান্ড দুজনেই দুটি করে গোল করে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে দুর্দান্ত সূচনা করেছেন। অন্যদিকে লিওনেল মেসি হ্যাটট্রিক করে তাদের সবাইকে ছাপিয়ে গেছেন।
কিন্তু সৌদি আরবে খেলা রোনাল্ডো তার ষষ্ঠ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে বেশিরভাগ সময়ই নিষ্প্রভ ছিলেন। হিউস্টোনে পর্তুগাল কষ্ট করে ১-১ গোলে ড্র করে।
৪১ বছর বয়সী রোনাল্ডো পুরো ম্যাচে মাত্র ২৫ বার বল স্পর্শ করেছেন, যা পর্তুগালের হয়ে কোনো বড় টুর্নামেন্টে পূর্ণ সময় খেলে তার সর্বনিম্ন স্পর্শের রেকর্ড। ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে ক্যারিয়ারের ১,০০০ গোলের মাইলফলকের দিকে এগিয়ে চলা রোনাল্ডোা এখন বডড় টুর্নামেন্টে টানা ১০ ম্যাচে গোলহীন।
কোচ রবার্তো মার্টিনেজের সামনে এখন কঠিন সিদ্ধান্ত, ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম অসাধারণ ক্যারিয়ারের অধিকারী এই খেলোয়াড়কে কি একাদশ থেকে বাদ দেওয়া হবে?
৪৮ দলের বিশ্বকাপের পক্ষে জোরালো বার্তা দিল কেপ ভার্দে
স্পেনের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করার পর কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনহাকে সতীর্থদের বুকে মাথা রেখে কাঁদতে দেখা যায়। এটি ছিল প্রথম রাউন্ডের অন্যতম স্মরণীয় দৃশ্য।
মাত্র পাঁচ লাখের কিছু বেশি জনসংখ্যার দ্বীপদেশ কেপ ভার্দে ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে রুখে দেয়। আটলান্টায় স্পেনের সহজ জয়ের প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু তারা মুখোমুখি হয় অনুপ্রাণিত ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক এবং বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম অংশগ্রহণকে স্মরণীয় করে রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ একটি জাতির।
এই পারফরম্যান্সের মাধ্যমে কেপ ভার্দে ৪৮ দলের সম্প্রসারিত বিশ্বকাপের সমালোচকদেরও জবাব দিয়েছে। সমালোচকদের মধ্যে ছিলেন উয়েফা সভাপতি আলেক্সান্দার সেফেরিন, যিনি বলেছিলেন এই ফরম্যাটে “একেবারেই অনাকর্ষণীয়” কিছু ম্যাচ হবে।
ভোজিনহার বীরত্বপূর্ণ পারফরম্যান্স তাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাতারাতি তারকায় পরিণত করেছে। ম্যাচের আগে তার ইনস্টাগ্রাম অনুসারী ছিল ৫০ হাজার। এখন তা প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখে পৌঁছেছে, যা এনএফএল তারকা প্যাট্রিক মাহোমেস এবং এনবিএ তারকা ভিক্টর ওয়েমবানিয়ামার চেয়েও বেশি।
চড়া টিকিটের দামেও দর্শকে ভরা স্টেডিয়াম
মঙ্গলবার অস্ট্রিয়া ও জর্ডানের ম্যাচে লেভাইস স্টেডিয়াম প্রায় পূর্ণ দর্শকে ভরে যাওয়া প্রমাণ করেছে যে উচ্চ টিকিট মূল্যও এই বিশ্বকাপে দর্শকদের নিরুৎসাহিত করতে পারেনি।
ফিফা জানিয়েছে, এ বছর এই স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত সুপার বোল ম্যাচে সরকারি হিসেবে উপস্থিত দর্শকসংখ্যা ছিল ৬৮,৫২৭ জন। মঙ্গলবার মোট ২,৮১,২২৩ জন দর্শক বিভিন্ন স্টেডিয়ামে প্রবেশ করেন, যা এক দিনে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ দর্শক উপস্থিতির নতুন রেকর্ড।
এর আগে ১৯৯৪ সালের ২৮ জুন স্থাপিত রেকর্ড ছিল ২,৭৭,০৭০ জন।
রেফারিরা লাল কার্ড দেখাতে সংযত ২০১৮ ও ২০২২ সালের বিশ্বকাপে মাত্র চারটি করে লাল কার্ড দেখানো হয়েছিল যা আগের আসরগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
এবারের আসরে শুরুতে মনে হচ্ছিল লাল কার্ডের বন্যা বয়ে যেতে পারে। উদ্বোধনী ম্যাচে সহ-আয়োজক মেক্সিকো ১০ জন নিয়ে খেলেও ৯ জনের দক্ষিণ আফ্রিকাকে ২-০ গোলে হারায়, আর সেই ম্যাচে তিনজন খেলোয়াড় লাল কার্ড দেখেন।
তবে ধারণা করা হচ্ছে, ব্রাজিলিয়ান রেফারি উইলটন সামপাইওর ওই ম্যাচের পারফরম্যান্সের পর ফিফা রেফারিদের আরও সতর্কভাবে লাল কার্ড ব্যবহার করতে উৎসাহিত করেছে।
ফলস্বরূপ পরবর্তী ২৩টি ম্যাচে একজন খেলোয়াড়কেও মাঠ থেকে বহিষ্কার করা হয়নি।
মন্তব্য করুন