হাওর বেষ্টিত জনপদ সুনামগঞ্জ। বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাসের সাথে যুদ্ধ করে হাওরাঞ্চলের মানুষের বসবাস। এবারও টানা বৃষ্টি এবং বৈরী আবহাওয়ার কারণে হাওরের কৃষকরা সঠিক সময়ে ধান কাটতে পারেননি। টানা বর্ষণ ও জলাবদ্ধতার কারণে কৃষকরা হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। ধান কাটলেও সুনামগঞ্জের হাওরে রোদের দেখা মিলছিল না। বেশ কয়েকদিন টানা বৃষ্টির পর আজ আকাশে রোদ দেখা দেওয়ায় জেলার কৃষাণ-কৃষাণিরা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন।
আজ হাওর ঘুরে দেখা যায়, ভেজা ধান শুকাতে খলায় খলায় ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষাণ-কৃষাণিরা। অনেকে আবার বুক সমান পানিতে ভিজে পানিতে ডুবে যাওয়া ধান কাটছেন। একসাথে সবার ধান কাটা শুরু হওয়ায় এলাকায় শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। আবার শ্রমিক পাওয়া গেলেও তাদের মজুরি অনেক বেশি।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার গৌরারং ইউনিয়নের কৃষক মনিন্দ্র কুমার দাস বাসসকে বলেন, জোয়াল ভাঙা হাওরে ১২ কেয়ার জমিতে বোরো চাষ করেছিলাম। জমির পাকা ধান এখন পানির নিচে। পানির নিচ থেকেই ধান কাটছি। নিজেকে সান্ত¦না দিচ্ছি এই বলে যে, ‘ধান যাই পাই, গো-খাদ্য তো পাবো’।
গৌরারং গ্রামের কৃষক আব্দুল গফুর জানান, তিনি খরচার হাওরে ৪ কেয়ার জমি চাষ করছিলেন। জমিগুলো এখন পানির নিচে।
আহমদাবাদ গ্রামের হনুফা বেগম বাসসকে বলেন, আমার পরিবারে ৯ জন সদস্য। পাকা ধানের জমিগুলো এখন পানির নিচে। বছর চলবে কী করে?
সরেজমিনে দেখা যায়, হাওড়জুড়ে এখন সোনালি ধানের সুবাস থাকার কথা থাকলেও বাতাসে ভাসছে পচা ধানের গন্ধ। রোববার ও সোমবার আকাশে কিছুটা রোদের দেখা মিললেও কৃষকদের কপাল থেকে দুশ্চিন্তার ভাঁজ সরেনি। গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি আর জলাবদ্ধতায় খলায় রাখা ধানে চারা গজিয়ে পচন ধরেছে। জেলাজুড়ে প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে জলাবদ্ধতা। কৃষকেরা সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কে ধান বিছিয়ে রোদে শুকাচ্ছেন। হাওরের পাশে খলায় খলায় নারী এবং পুরুষ ধান শুকাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
হালির হাওরের বাসিন্দা ওলিউল্লাহ বলেন, হাওরে রোদ উঠেছে। ভেজা ধান শুকাচ্ছি। অনেক ধানে পচন ধরেছে। কয়েকদিন রোদ হলে কৃষকরা খরচের টাকা তুলতে পারতেন।
ওয়েজখালি গ্রামের কৃষক ওয়েছ মিয়া বলেন, আকাশে কড়া রোদ। এখন খুশিতে খলায় ধান শুকাচ্ছি। কিন্তু শঙ্কা কাটেনি। ধানের রং নষ্ট হয়ে গেছে। কিছু ধান রক্ষা পেলেও ধারদেনা পরিশোধ করতে পারবো না। এখনও খোরাকির ধান ঘরে উঠেনি।
কৃষি বিভাগ জানায়, চলতি মৌসুমে হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর বোরো আবাদ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৪ লাখ মেট্রিক টন। যার বাজার মূল্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। হাওর ও নন হাওরে ধান কর্তন হয়েছে ৬২ শতাংশ। ২০ হাজার হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ওমর ফারুক বাসসকে বলেন, হাওরে ভেজা ধান শুকানোর জন্য মিল মালিকদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রোদে হাওরের কৃষকরা ধান শুকাচ্ছেন। আমরা কৃষকদের পাকা ধান দ্রুত কাটতে বলেছি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী সুনামগঞ্জে এখনো বন্যার শঙ্কা আছে। টানা বৃষ্টি হওয়ায় বাঁধগুলোও দুর্বল হয়ে পড়েছে।
মন্তব্য করুন