সায়মন খান | লিড নিউজ ২৪
মহাবিশ্বের অসংখ্য নক্ষত্রের মধ্যে এবার এক ব্যতিক্রমী নক্ষত্রের সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। সাধারণত নক্ষত্রকে সাদা, লালচে, কমলা কিংবা নীলাভ রঙে দেখা গেলেও এবার এমন একটি নক্ষত্র শনাক্ত হয়েছে, যা মানুষের চোখে সবুজ দেখানোর কথা। বিজ্ঞানীদের দাবি, জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে এ ধরনের নক্ষত্র শনাক্ত হওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম।
অবাক করার বিষয় হলো, বিরল এই নক্ষত্রের অবস্থান আমাদের নিজস্ব ছায়াপথ মিল্কিওয়েতেই। পৃথিবী থেকে প্রায় ২৮০ আলোকবর্ষ দূরে ড্রাকো নক্ষত্রমণ্ডলে অবস্থিত নক্ষত্রটির বৈজ্ঞানিক নাম ‘WD J1330+6435’। এটি মূলত একটি শ্বেত বামন বা হোয়াইট ডোয়ার্ফ নক্ষত্র, যা জীবনের শেষ পর্যায়ে পৌঁছানো একটি নক্ষত্রের অবশিষ্ট কেন্দ্রীয় অংশ।
যুক্তরাজ্যের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্পদার্থবিদ মার্ক হল্যান্ডসের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় এই ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য উঠে এসেছে। গবেষণার বিস্তারিত ফলাফল গত ১৫ অক্টোবর আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘RAS Techniques and Instruments’-এ প্রকাশিত হয়।
নক্ষত্রের রং সবুজ হলো কীভাবে?
বিজ্ঞানীদের মতে, সাধারণ নক্ষত্রের রং মূলত তার পৃষ্ঠের তাপমাত্রার ওপর নির্ভর করে। অপেক্ষাকৃত কম তাপমাত্রার নক্ষত্র লালচে বা কমলা দেখায়। সূর্যের মতো নক্ষত্রের আলো প্রায় সাদা, আর অত্যন্ত উত্তপ্ত নক্ষত্রের রং হয় নীলাভ।
তবে নতুন শনাক্ত হওয়া নক্ষত্রটির ক্ষেত্রে প্রচলিত এই ধারণার বাইরে এক ভিন্ন বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া কাজ করছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, WD J1330+6435 নক্ষত্রটির তাপমাত্রা প্রায় চার হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস। একসময় এর চারপাশে থাকা গ্রহ ও গ্রহাণুর পাথুরে ধ্বংসাবশেষ নক্ষত্রটির বায়ুমণ্ডলে জমা হয়েছে। এর ফলে সেখানে সোডিয়াম, ক্যালসিয়াম ও লিথিয়ামের মতো মৌলের উপস্থিতি বেড়েছে।
নক্ষত্রটির অত্যন্ত ঘন হিলিয়ামসমৃদ্ধ বায়ুমণ্ডলে এসব মৌল আলোর নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্য শোষণ করে। বিশেষ করে সোডিয়ামের প্রভাবে হলুদ, কমলা ও লাল বর্ণালির উল্লেখযোগ্য অংশ শোষিত হওয়ায় অবশিষ্ট আলোর সম্মিলিত রং সবুজাভ হয়ে ওঠে।
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, নক্ষত্রটি কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হলে মানুষের চোখে হলুদাভ-সবুজ বা চার্ট্রুজ রঙের দেখাবে।
মৃতপ্রায় নক্ষত্রের রহস্যময় পরিবর্তন
সূর্যের মতো অপেক্ষাকৃত কম ও মাঝারি ভরের নক্ষত্রের কেন্দ্রের পারমাণবিক জ্বালানি শেষ হয়ে গেলে একপর্যায়ে তাদের বাইরের স্তর মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে। অবশিষ্ট অত্যন্ত ঘন ও উত্তপ্ত কেন্দ্রীয় অংশটি শ্বেত বামন নক্ষত্রে পরিণত হয়।
এ ধরনের নক্ষত্রে আগের মতো কেন্দ্রীয় পারমাণবিক সংযোজনের মাধ্যমে শক্তি উৎপন্ন হয় না। তবে সঞ্চিত তাপের কারণে এগুলো দীর্ঘ সময় ধরে আলো বিকিরণ করতে থাকে।
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, কিছু শ্বেত বামন নক্ষত্রের প্রচণ্ড মহাকর্ষীয় আকর্ষণে আশপাশের গ্রহাণু ও পাথুরে বস্তু ভেঙে তাদের উপাদান নক্ষত্রের বায়ুমণ্ডলে মিশে যেতে পারে। এতে বায়ুমণ্ডলের রাসায়নিক গঠন বদলে যায় এবং আলোর বর্ণালিতেও অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটে।
সবুজের পাশাপাশি গোলাপি ও বেগুনি নক্ষত্রও
গবেষণায় কেবল সবুজ নক্ষত্রের বিষয়টিই সামনে আসেনি। বিজ্ঞানীরা দেখতে পেয়েছেন, শ্বেত বামন নক্ষত্রের রাসায়নিক উপাদানের ভিন্নতার কারণে গোলাপি, বেগুনি, হলুদ ও নীলচে-সবুজ রঙের উপস্থিতিও সম্ভব।
গবেষক দল পৃথিবী থেকে প্রায় ৬৫ আলোকবর্ষের মধ্যে থাকা ১৫১টি শ্বেত বামন নক্ষত্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে। এর মধ্যে পাঁচটির রং অস্বাভাবিক বলে শনাক্ত হয়। দুটি নক্ষত্র হলুদাভ এবং তিনটি গোলাপি রঙের।
এই ফলাফলের ভিত্তিতে গবেষকদের ধারণা, মহাবিশ্বের প্রায় প্রতি ৩০টি শ্বেত বামন নক্ষত্রের মধ্যে একটি স্বাভাবিকের বাইরে ভিন্ন রঙের হতে পারে।
আরেকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ WD J1011+2845। পৃথিবী থেকে প্রায় ৪৮ আলোকবর্ষ দূরে থাকা এই নক্ষত্রের বায়ুমণ্ডলে কার্বনের উপস্থিতি বিশেষ ধরনের আলোক শোষণের সৃষ্টি করে, যার ফলে নক্ষত্রটি গাঢ় গোলাপি রঙের দেখানোর কথা।
সরাসরি দেখা নয়, আলোর বিশ্লেষণে আবিষ্কার
তবে বিজ্ঞানীরা সবুজ নক্ষত্রটিকে মানুষের চোখে সরাসরি সবুজ অবস্থায় দেখেননি। পৃথিবী থেকে এত দূরের শ্বেত বামন নক্ষত্রগুলোর দৃশ্যমান পৃষ্ঠ আলাদাভাবে শনাক্ত করা সম্ভব নয়।
এ কারণে গবেষকরা নক্ষত্র থেকে আসা আলোর বর্ণালি বিশ্লেষণ করে মানুষের রং দেখার ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে কম্পিউটার মডেলের সাহায্যে সম্ভাব্য রং নির্ধারণ করেছেন।
গবেষক মার্ক হল্যান্ডসের মতে, শ্বেত বামন নক্ষত্রের অত্যন্ত ঘন বায়ুমণ্ডল এমন সব রঙের সৃষ্টি করতে পারে, যা প্রচলিত নক্ষত্রের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত নয়। এই ফলাফল গবেষকদেরও বিস্মিত করেছে।
ভবিষ্যতে সূর্যের ক্ষেত্রেও কি এমন হতে পারে?
জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের ধারণা অনুযায়ী, আরও কয়েকশ কোটি বছর পর সূর্যও তার বর্তমান জীবনচক্র শেষ করে একসময় শ্বেত বামন নক্ষত্রে পরিণত হবে।
তবে সূর্য তখন সবুজ রং ধারণ করবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। এর জন্য প্রয়োজন হবে বিশেষ ধরনের বায়ুমণ্ডলীয় রাসায়নিক গঠন এবং উপযুক্ত ভৌত পরিস্থিতি।
বিজ্ঞানীদের মতে, নতুন এই গবেষণা নক্ষত্রের রং সম্পর্কে দীর্ঘদিনের ধারণাকে আরও বিস্তৃত করেছে। একই সঙ্গে নক্ষত্রের মৃত্যুর পর তার চারপাশের গ্রহীয় ধ্বংসাবশেষ কীভাবে বায়ুমণ্ডলের গঠন ও আলোর বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করতে পারে, সে বিষয়ে নতুন গবেষণার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
মহাকাশের অসংখ্য অজানা রহস্যের মধ্যে সবুজ নক্ষত্রের এই সন্ধান জ্যোতির্বিজ্ঞানের গবেষণায় একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মন্তব্য করুন