আন্তর্জাতিক | লিড নিউজ ২৪
আফ্রিকার যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ সুদানে বাজারফেরত সাধারণ মানুষের ওপর ভয়াবহ ড্রোন হামলায় অন্তত ৮০ জন নিহত হয়েছেন। দেশটির পশ্চিম কর্দোফান রাজ্যের আল-দিবাব শহরে একটি ব্যস্ত পরিবহনকেন্দ্রে এ হামলার ঘটনা ঘটে। নিহতদের অধিকাংশই বাজার শেষে নিজ নিজ গ্রামে ফেরার জন্য গাড়ির অপেক্ষায় ছিলেন।
রোববার (১৮ অক্টোবর) সন্ধ্যায় সংঘটিত এ হামলাকে ২০২৩ সালে সুদানে গৃহযুদ্ধ শুরুর পর থেকে বেসামরিক মানুষের ওপর চালানো অন্যতম প্রাণঘাতী হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও চিকিৎসাকর্মীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আল-দিবাব শহরের একটি বাজারের কাছে অবস্থিত পরিবহনকেন্দ্রে মাত্র ১০ মিনিটের ব্যবধানে দুটি ড্রোন হামলা চালানো হয়। এতে ঘটনাস্থলেই বহু মানুষ প্রাণ হারান। আহতদের উদ্ধার করে পার্শ্ববর্তী আল-মুজলাদ শহরে নেওয়া হলে সেখানে আরও কয়েকজনের মৃত্যু হয়।
হামলার প্রত্যক্ষদর্শী আহমেদ আবু বকর ওয়াদি জানিয়েছেন, প্রতিদিনের মতো ওই দিনও বাজার শেষ হওয়ার পর আশপাশের গ্রামের মানুষ বাড়ি ফেরার জন্য পরিবহনকেন্দ্রে জড়ো হয়েছিলেন। ঠিক সেই সময় আকাশ থেকে ড্রোনের মাধ্যমে হামলা চালানো হয়।
ভয়াবহ সেই ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি জানান, হামলার পর ৫০ জনের মরদেহ দাফনের কাজে তিনি নিজেই অংশ নিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে তাঁর আপন ভাই মোহাম্মদও রয়েছেন।
ওয়াদি আরও জানান, হামলায় আহত ৪৭ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য নিকটবর্তী আল-মুজলাদ শহরে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে একজন চিকিৎসাকর্মী নিশ্চিত করেছেন।
নিরাপত্তার কারণে পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই চিকিৎসাকর্মী জানান, আল-দিবাবের হামলায় মোট ৮০ জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া আল-মুজলাদ শহরেও পৃথক ড্রোন হামলায় আরও চারজন আহত হয়েছেন। তাঁদের চিকিৎসা চলছে।
হামলার দায় নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
সুদানের পশ্চিম কর্দোফান অঞ্চল বর্তমানে আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আরএসএফ-সমর্থিত প্রশাসন এই হামলার জন্য সুদানের সরকারি সেনাবাহিনীকে দায়ী করেছে।
তবে হামলার বিষয়ে সেনাবাহিনীর সরাসরি কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে কারা হামলাটি চালিয়েছে, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
এর আগে দক্ষিণ দারফুরের রাজধানী নিয়ালার একটি ব্যস্ত পশুর হাটেও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে। ওই হামলায় আরএসএফের সদস্যদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে সেনাবাহিনী দাবি করলেও আরএসএফের অভিযোগ ছিল, সেখানে অন্তত ৩০ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন।
সাম্প্রতিক এসব ঘটনায় সুদানের চলমান সংঘাতে ড্রোনের ব্যবহার এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত সুদান
২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে সুদানের সেনাপ্রধান জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান এবং আধাসামরিক বাহিনী আরএসএফের প্রধান মোহাম্মদ হামদান দাগালোর মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব সশস্ত্র সংঘাতে রূপ নেয়।
রাজধানী খার্তুম থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাত ক্রমেই দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘদিনের যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এক কোটির বেশি মানুষ।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ড্রোন হামলায় অন্তত ৮৮০ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন বলে প্রকাশিত পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে। ওই সময়ে সংঘাত-সংশ্লিষ্ট বেসামরিক মৃত্যুর ৮০ শতাংশের বেশি ঘটেছে ড্রোন হামলায়।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সুদানে প্রায় ৩ কোটি ৩৭ লাখ মানুষের মানবিক সহায়তা প্রয়োজন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৭৩ লাখ শিশু রয়েছে। খাদ্যসংকট, অপুষ্টি, বাস্তুচ্যুতি এবং চিকিৎসাসেবার অভাবে দেশটির মানবিক পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।
শান্তি প্রতিষ্ঠায় অগ্রগতি নেই
সুদানের চলমান সংঘাত নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির রাজনৈতিক ও শান্তি প্রতিষ্ঠাবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল রোজমেরি ডিকার্লো সম্প্রতি নিরাপত্তা পরিষদে জানিয়েছেন, দেশটির রাজনৈতিক ও মানবিক পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে।
তাঁর মতে, সংঘাতে জড়িত পক্ষগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পরিবর্তে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিদেশি সমর্থনও যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যুদ্ধবিরতি ও মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হলেও এখন পর্যন্ত স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার কার্যকর কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।
এর মধ্যেই আল-দিবাবের বাজারফেরত সাধারণ মানুষের ওপর ভয়াবহ ড্রোন হামলা আবারও স্পষ্ট করে দিয়েছে, সুদানের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষমতার লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে নিরীহ বেসামরিক জনগণকে।
মন্তব্য করুন