সায়মন খান | লিড নিউজ ২৪:
ভারতকে নিজের দেশ মনে করেন, দেশটির নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অধিকারও পেতে চেয়েছিলেন। এ জন্য ভারতীয় নাগরিকত্ব ও পাসপোর্ট পাওয়ার চেষ্টার কথাও জানিয়েছিলেন বলিউড অভিনেতা ইমরান খান। অথচ সেই ভারতেই একটি প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ায় এবার তাঁকে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঘটনাটি ঘিরে বলিউডের পাশাপাশি ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা শুরু হয়েছে।
বলিউড তারকা আমির খানের ভাগনে ইমরান খান জন্মসূত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। তবে শৈশব থেকে ভারতে বেড়ে ওঠা এই অভিনেতার দেশটির প্রতি আবেগ ও নাগরিকত্ব পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার কথা উঠে এসেছে তাঁর পুরোনো কয়েকটি সাক্ষাৎকারে। সাম্প্রতিক বিতর্কের মধ্যে সেই বক্তব্যগুলো আবার আলোচনায় এসেছে।
গত ১০ অক্টোবর ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে মুম্বাইয়ের আগস্ট ক্রান্তি ময়দান এলাকায় আয়োজিত প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেন ইমরান খান। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) দাবির সমর্থনে আয়োজিত ওই কর্মসূচি থেকে তাঁকেসহ কয়েকজনকে আটক করে পুলিশ। পরে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
তবে ঘটনার কয়েক দিন পরই নতুন জটিলতায় পড়েন অভিনেতা। বিদেশি নাগরিক হিসেবে রাজনৈতিক প্রতিবাদে অংশ নিয়ে অভিবাসনসংক্রান্ত বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে ভারতের ফরেনার্স রিজিওনাল রেজিস্ট্রেশন অফিস (এফআরআরও) তাঁকে আগামী ২৮ অক্টোবরের মধ্যে দেশ ছাড়ার নোটিশ দেয়।
ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতা কিরীট সোমাইয়ার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
ভারতীয় পাসপোর্ট পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন ইমরান
নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই সামনে এসেছে ইমরান খানের ২০১১ সালের একটি সাক্ষাৎকার। সেখানে তিনি জানিয়েছিলেন, ভারতীয় পাসপোর্ট পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। তাঁর প্রত্যাশা ছিল, দ্রুতই সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
ওই সাক্ষাৎকারে অভিনেতা আরও জানিয়েছিলেন, ভারতকে তিনি নিজের দেশ মনে করেন। দেশটির মানুষের জন্য কিছু করা এবং সামাজিক দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
এর আগে ২০০৯ সালের একটি সাক্ষাৎকারে ইমরান জানিয়েছিলেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বারাক ওবামাকে ভোট দিয়েছিলেন।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা থাকলেও ভারতে ভোট দিতে না পারার বিষয়টি তাঁকে হতাশ করত।
২০১৩ সালের আরেকটি সাক্ষাৎকারে সেই হতাশার কথা জানিয়ে ইমরান বলেন, মার্কিন নাগরিক হওয়ায় ভারতের নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন না তিনি। তবে অন্যদের ভোটদানে উৎসাহিত করার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেন। এমনকি ২০ জন মানুষকেও ভোট দিতে উৎসাহিত করতে পারলে সেটিকে নিজের অবদান হিসেবে বিবেচনা করবেন বলে জানিয়েছিলেন অভিনেতা।
ভারতেই বেড়ে ওঠা, তবু নাগরিকত্ব যুক্তরাষ্ট্রের
১৯৮৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিনে জন্মগ্রহণ করেন ইমরান খান। তাঁর মা নুজহাত খান বলিউড অভিনেতা আমির খানের বোন এবং বাবা অনিল পাল। যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনার সময় তাঁদের সংসারে ইমরানের জন্ম হয়।
বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর মাত্র তিন বছর বয়সে মায়ের সঙ্গে মুম্বাইয়ে চলে আসেন ইমরান। সেখানেই তাঁর শৈশব ও বেড়ে ওঠা।
দীর্ঘদিন ভারতে বসবাস করলেও তাঁর নাগরিকত্ব যুক্তরাষ্ট্রের। তবে তিনি ওভারসিজ সিটিজেন অব ইন্ডিয়া (ওসিআই) কার্ডধারী।
এই কার্ডের মাধ্যমে ভারতীয় বংশোদ্ভূত বিদেশি নাগরিকেরা ভারতে দীর্ঘমেয়াদে বসবাস ও যাতায়াতের বিশেষ সুবিধা পান। কিন্তু ওসিআই কার্ড পূর্ণ ভারতীয় নাগরিকত্বের সমতুল্য নয়। ফলে এই কার্ডধারীরা দেশটির জাতীয় বা রাজ্য নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন না।
দেশ ছাড়ার নোটিশ নিয়ে আইনি লড়াই
ইমরান খানের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তাঁর আইনজীবীদের বক্তব্য, ওসিআই কার্ডধারী কোনো ব্যক্তি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে অংশ নিতে পারবেন না—এমন সরাসরি নিষেধাজ্ঞা নেই। তাই শুধু প্রতিবাদ কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকার কারণে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া কতটা আইনসম্মত, তা বিচারিক পর্যালোচনার বিষয়।
নোটিশের বিরুদ্ধে বোম্বে হাইকোর্টে আইনি প্রতিকার চাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন অভিনেতা।
অন্যদিকে, ভারতীয় কর্তৃপক্ষের অবস্থান হচ্ছে, বিদেশি নাগরিকদের দেশটিতে অবস্থান ও কার্যক্রমের ক্ষেত্রে অভিবাসন আইন এবং সংশ্লিষ্ট বিধিনিষেধ মেনে চলতে হবে।
ইমরান খানের এই ঘটনা নতুন করে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—যে ব্যক্তি শৈশব থেকে একটি দেশে বেড়ে উঠেছেন এবং দেশটিকে নিজের মাতৃভূমি হিসেবে বিবেচনা করেন, রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকারের ক্ষেত্রে তাঁর অবস্থান কী হবে?
একসময় ভারতীয় নাগরিকত্ব নিয়ে নির্বাচনে ভোট দেওয়ার স্বপ্ন দেখা ইমরান খান এখন সেই দেশেই নিজের অবস্থানের অধিকার রক্ষায় আইনি লড়াইয়ের মুখোমুখি। শেষ পর্যন্ত আদালতের সিদ্ধান্তই তাঁর পরবর্তী অবস্থান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মন্তব্য করুন