সায়মন খান | লিড নিউজ ২৪
রাশিয়ায় ভালো বেতনে চাকরির স্বপ্ন দেখিয়ে বাংলাদেশি তরুণদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বিদেশে। প্রতিশ্রুতি ছিল নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে কাজের। কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর সেই স্বপ্ন পরিণত হয় ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে। পাসপোর্ট ও মুঠোফোন কেড়ে নিয়ে তাঁদের বাধ্য করা হয় রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে। মাত্র ২১ দিনের সামরিক প্রশিক্ষণের পর পাঠানো হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখসারিতে। সেখানে প্রথম দিনেই ড্রোন হামলায় ১৭ বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এসআরবি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এসআরবি-১০-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোহা. আসাদুজ্জামান।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, সংঘবদ্ধ মানবপাচার চক্রের মাধ্যমে রাশিয়ায় যাওয়া ৩০ বাংলাদেশির মধ্যে এখন পর্যন্ত ২০ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে ১৭ জন যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার প্রথম দিনেই ড্রোন হামলার শিকার হন। পরে বিভিন্ন সময়ে আরও তিনজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়। তবে এসব মৃত্যুর তথ্য এসআরবির প্রাথমিক অনুসন্ধানের ভিত্তিতে পাওয়া গেছে।
এসআরবির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরও উদ্বেগজনক তথ্য। যুদ্ধের কোনো অভিজ্ঞতা না থাকা বাংলাদেশিদের রণক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছিল প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করার উদ্দেশ্যে। তাঁদের সামনে রেখে প্রতিপক্ষের ড্রোন হামলার উৎস ও দূরত্ব নির্ধারণের চেষ্টা করা হতো বলে দাবি করেছে সংস্থাটি।
অতিরিক্ত ডিআইজি আসাদুজ্জামান জানান, যাঁদের বাংলাদেশ থেকে নেওয়া হয়েছিল, তাঁরা কেউই পেশাদার সৈনিক ছিলেন না। যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় শারীরিক সক্ষমতা, প্রশিক্ষণ কিংবা সামরিক কৌশল সম্পর্কে তাঁদের পর্যাপ্ত ধারণা ছিল না। মাত্র তিন সপ্তাহের প্রশিক্ষণে তাঁদের সম্মুখযুদ্ধে পাঠানোর পেছনে প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করার উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে এসআরবি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, গত ৭ মে প্রায় ৩০ জন বাংলাদেশি নির্মাণ খাতে চাকরির আশায় রাশিয়ায় যান। বিদেশে পাঠানোর বিনিময়ে তাঁদের কাছ থেকে গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা করে নেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর নির্ধারিত কর্মস্থলে পাঠানোর পরিবর্তে তাঁদের রুশ সামরিক বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
এসআরবি জানিয়েছে, যুদ্ধক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের বিভিন্ন দলে ভাগ করে মোতায়েন করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে দুজন গুরুতর আহত অবস্থায় দেশে ফিরতে সক্ষম হয়েছেন। আরও দুজন বর্তমানে মস্কোর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বাকি ছয়জন এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে রয়েছেন বলে সংস্থাটির কাছে তথ্য রয়েছে।
দেশে ফিরে আসা ব্যক্তিদের একজন রাজন হোসেন। নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করার আশায় ৮ লাখ ২৫ হাজার টাকা খরচ করে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন হামলায় তাঁর কোমরের হাড় ভেঙে যায় এবং দুই পায়ের শক্তি হারিয়ে ফেলেন। গুরুতর আহত অবস্থায় চরম দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হয় তাঁকে। পরে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় গত ২৩ আগস্ট দেশে ফেরেন তিনি।
দেশে ফেরার পর প্রতারণার ক্ষতিপূরণ দাবি করলে রাজনের পরিবারকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে পাচার চক্রের সদস্যদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় তাঁর বাবার অভিযোগের ভিত্তিতে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ থানায় মানবপাচারসংক্রান্ত আইনে মামলা করা হয়।
এদিকে মানবপাচারের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে এসআরবি। তাঁরা হলেন মিজানুর রহমান (৫৫) ও আবু তাহের ওরফে লেন্টু (৫০)। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) ফরিদপুরের নগরকান্দা ও ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ এলাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়।
এসআরবি কর্মকর্তাদের দাবি, মিজানুর রহমান জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একাধিক বাংলাদেশিকে রাশিয়ায় পাঠানোর তথ্য পাওয়া গেছে। মানবপাচারের ঘটনায় আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির সম্পৃক্ততার বিষয়েও তদন্ত চলছে।
তদন্তে রাশিয়ার ইগর নামের এক ব্যক্তি এবং কিরগিজস্তানের জুলিয়া নামের এক নারীর সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার কথাও জানিয়েছেন এসআরবি কর্মকর্তারা। তাঁদের ভূমিকা যাচাইয়ের পাশাপাশি চক্রের পলাতক সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, পাচারের শিকার ব্যক্তিদের অধিকাংশই নিম্নআয়ের পরিবারের সদস্য। সংসারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি এবং পরিবারের জন্য ভালো ভবিষ্যৎ গড়ার আশায় অনেকে ধারদেনা করে বিদেশে গিয়েছিলেন। কিন্তু প্রতারণার শিকার হয়ে তাঁদের কেউ প্রাণ হারিয়েছেন, কেউ গুরুতর আহত হয়েছেন, আবার কেউ এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে আটকা পড়ে আছেন।
নিহত ব্যক্তিদের অনেক পরিবার স্বজনের মৃত্যুর খবর পেলেও এখন পর্যন্ত মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে পারেনি। ফলে তাঁদের পরিবারগুলোর মধ্যে গভীর অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এসআরবি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, জামালপুর, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ী ও গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ এ ধরনের চক্রের মাধ্যমে রাশিয়ায় গেছেন বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য পাওয়া গেছে।
বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভনে প্রতারিত না হতে সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে এসআরবি। পাশাপাশি বিদেশে যাওয়ার আগে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের বৈধতা, চাকরির চুক্তি ও কাজের প্রকৃত ধরন যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশিদের মানবপাচার এবং তাঁদের জোরপূর্বক যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর এসব অভিযোগ নতুন করে বিদেশগামী কর্মীদের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
মন্তব্য করুন