নিউজ ডেস্ক
৫১ minutes আগে
অনলাইন সংস্করণ
পাঠক সংখ্যা ২৬ জন

ফ্যাসিবাদমুক্ত জাতি গঠনে প্রবাসীদের কার্যকর ভূমিকা লেখক: মোহাম্মদ হারুনুর রশিদ

রিমন হোসেন, সৌদি আরব

ফ্যাসিবাদমুক্ত জাতিগঠনে প্রবাসীদের কার্যকর ভূমিকা
-হারুনুর রশিদ চেয়ারম্যান, কানেক্ট বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল লন্ডন

ভূমিকা
একটি জাতির শক্তি কেবল তার ভৌগোলিক সীমানার ভেতরে বসবাসরত মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। দেশের বাইরে ছড়িয়ে থাকা নাগরিক ও বংশোদ্ভূত মানুষেরাও সেই জাতির প্রাণশক্তির অংশ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ কথা আরও বেশি সত্য। প্রবাসী বাংলাদেশিরা শুধু রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতি সচল রাখেননি; ইতিহাসের প্রতিটি সংকটময় মুহূর্তে তাঁরা স্বাধীনতা, ন্যায় ও গণতন্ত্রের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পর্যন্ত তাঁদের ভূমিকা প্রমাণ করে, প্রবাসীরা দূরে থেকেও জাতির ভাগ্য নির্ধারণে সক্রিয় অংশীদার।

আজ বাংলাদেশ এক নতুন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসানের পর একটি জবাবদিহিমূলক, অংশগ্রহণমূলক ও ফ্যাসিবাদমুক্ত রাষ্ট্র গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা এখন জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে। এই রাষ্ট্র নির্মাণে প্রবাসীদের কীভাবে কার্যকরভাবে যুক্ত করা যায়, সেটিই এই প্রবন্ধের মূল জিজ্ঞাসা।

বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশ
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বর্তমানে প্রায় দেড় কোটি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মানুষ বসবাস করছেন। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, পূর্ব এশিয়া ও আফ্রিকার নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা এই জনগোষ্ঠী একরকম নয়। মধ্যপ্রাচ্যে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি নারী-পুরুষ নির্মাণ, সেবা, পরিবহন ও গৃহস্থালি কাজে নিয়োজিত। সেখানে চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও শিক্ষকের মতো দক্ষ পেশাজীবীরাও কাজ করছেন।

অন্যদিকে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় বাংলাদেশি অভিবাসনের ইতিহাস তুলনামূলক দীর্ঘ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বহু বাংলাদেশি এসব দেশে পাড়ি জমান। যুক্তরাজ্যে আজ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত চতুর্থ প্রজন্মের ব্রিটিশ নাগরিকও রয়েছেন। তাঁরা সেখানকার সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে শিক্ষা, চিকিৎসা, আইন, ব্যবসা ও রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। কেউ কেউ সংসদ সদস্য, মেয়র এমনকি মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
প্রতিবছর হাজার হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যান। তাঁদের অনেকে পরে সেখানেই গবেষক, প্রযুক্তিবিদ, উদ্যোক্তা কিংবা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। ফলে প্রবাসী সমাজ আজ শুধু শ্রমশক্তির উৎস নয়, এটি জ্ঞান, দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের এক বিশাল ভাণ্ডার।

অর্থনীতির নীরব স্তম্ভ

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান সবচেয়ে দৃশ্যমান হয় রেমিট্যান্সের মাধ্যমে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসীরা প্রায় ৩৫.৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। এই অর্থ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করে, আমদানি ব্যয় মেটায় এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখে। লাখো পরিবারের সন্তানের লেখাপড়া, চিকিৎসা ও বাসস্থানের নিরাপত্তা নির্ভর করে এই অর্থের ওপর।

কিন্তু রেমিট্যান্সের আরেকটি দিকও আছে, যা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় স্পষ্ট হয়েছে। অর্থনৈতিক শক্তি কেবল উন্নয়নের হাতিয়ার নয়, এটি নৈতিক প্রতিবাদেরও ভাষা হতে পারে। প্রবাসীরা দেখিয়েছেন, রাষ্ট্র যখন নিজের নাগরিকের বিরুদ্ধে অস্ত্র তোলে, তখন তাঁদের পাঠানো অর্থও প্রশ্ন তুলতে পারে: এই অর্থ কার স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে?

একাত্তরে প্রবাসীদের ঐতিহাসিক ভূমিকা

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম কেবল দেশের ভেতরে সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যা শুরু হওয়ার পর বিশ্বের নানা প্রান্তে বসবাসরত বাঙালিরা তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিবাদে রাস্তায় নামেন।

এ ক্ষেত্রে ব্রিটিশ-বাঙালিদের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। লন্ডন, বার্মিংহাম, ম্যানচেস্টার, ব্র্যাডফোর্ডসহ বিভিন্ন শহরে তাঁরা সভা-সমাবেশ ও বিক্ষোভের আয়োজন করেন। বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত স্টিয়ারিং কমিটি এবং বিভিন্ন শহরের অ্যাকশন কমিটি প্রবাসী বাঙালিদের সংগঠিত করে। ট্রাফালগার স্কয়ারে হাজারো মানুষের সমাবেশ ব্রিটিশ গণমাধ্যম ও রাজনীতিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। প্রবাসীরা ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্যদের কাছে গণহত্যার তথ্য তুলে ধরেন, স্মারকলিপি দেন এবং বাংলাদেশের স্বীকৃতির দাবিতে জনমত গড়ে তোলেন।

সেই সময় লন্ডনের পূর্বাঞ্চলের রেস্তোরাঁকর্মী, কারখানার শ্রমিক ও ছোট ব্যবসায়ীরা নিজেদের সামান্য আয় থেকে অর্থ তুলে মুক্তিযুদ্ধের তহবিলে দান করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী বাঙালিরা কংগ্রেস সদস্যদের কাছে গিয়ে পাকিস্তানে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধের দাবি জানান। ইউরোপের অন্যান্য দেশেও একই ধরনের উদ্যোগ দেখা যায়। কূটনীতিকদের অনেকে পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেন, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধের নৈতিক বৈধতাকে শক্তিশালী করে।

একাত্তরের এই অভিজ্ঞতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিশ্বজনমত একটি শক্তিশালী অস্ত্র, আর সেই জনমত গঠনে প্রবাসীরাই হতে পারেন জাতির সবচেয়ে কার্যকর দূত।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান: প্রবাসের রাজপথে নতুন ইতিহাস

একাত্তরের পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর ২০২৪ সালের জুলাইয়ে প্রবাসীরা আবার ইতিহাসের সামনে দাঁড়ান। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন যখন রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নির্বিচার গুলিবর্ষণে রক্তাক্ত হয়ে ওঠে, তখন প্রবাসী বাংলাদেশিরা নীরব দর্শক হয়ে থাকেননি।

সরকার যখন দেশজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়ে তথ্যের অন্ধকার তৈরি করেছিল, তখন প্রবাসী সাংবাদিক, লেখক, অ্যাক্টিভিস্ট ও সাধারণ মানুষ সেই অন্ধকার ভেদ করার চেষ্টা করেন। দেশ থেকে কোনোভাবে পাঠানো ছবি, ভিডিও ও সাক্ষ্য তাঁরা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম, মানবাধিকার সংস্থা ও বিদেশি সরকারের কাছে পৌঁছে দেন। আবু সাঈদের দুই হাত প্রসারিত করে বুলেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য, কিংবা মুগ্ধর পানি বিতরণের স্মৃতি বিশ্বের নানা প্রান্তে প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে ওঠে।

লন্ডন, নিউইয়র্ক, টরন্টো, সিডনি, রোম, প্যারিস, বার্লিনসহ বহু শহরে প্রবাসীরা বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেন। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট, মার্কিন কংগ্রেস ও জাতিসংঘের কাছে তাঁরা হত্যাকাণ্ড বন্ধের দাবি জানান। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল ‘রেমিট্যান্স শাটডাউন’ বা বৈধ পথে অর্থ পাঠানো সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার আহ্বান। এই ডাকে বহু প্রবাসী সাড়া দেন এবং জুলাই মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহে লক্ষণীয় পতন দেখা যায়। এটি ছিল এক অভিনব অর্থনৈতিক প্রতিবাদ, যা শাসকগোষ্ঠীকে বুঝিয়ে দিয়েছিল যে প্রবাসীরা কেবল অর্থের জোগানদাতা নন, তাঁরা রাজনৈতিক বিবেকেরও ধারক।

এই আন্দোলনের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী অধ্যায় রচিত হয় সংযুক্ত আরব আমিরাতে। সেখানে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার দায়ে ৫৭ জন বাংলাদেশি শ্রমিককে দ্রুত বিচারে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড দেওয়া হয়, যাঁদের কয়েকজনের সাজা ছিল যাবজ্জীবন। যে দেশে প্রকাশ্য প্রতিবাদ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ, সেখানে জেনেশুনে ঝুঁকি নিয়ে তাঁরা দেশের ছাত্র-জনতার পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অনুরোধে আমিরাত সরকার তাঁদের ক্ষমা করে দেশে ফেরত পাঠায়। এই শ্রমিকদের আত্মত্যাগ প্রমাণ করে, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রবাসের সবচেয়ে সাধারণ মানুষটিও অসাধারণ সাহসের পরিচয় দিতে পারেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটে। এই বিজয়ের মূল কারিগর দেশের ছাত্র-জনতা হলেও প্রবাসীদের সম্মিলিত চাপ, তথ্যপ্রবাহ ও আন্তর্জাতিক জনমত গঠনের ভূমিকা ইতিহাসে স্বীকৃতি পাওয়ার দাবি রাখে।

ফ্যাসিবাদ কেন ফিরে আসে

ফ্যাসিবাদ কোনো একক ব্যক্তি বা দলের নাম নয়; এটি একটি শাসনপদ্ধতি ও মানসিকতা। যখন ক্ষমতা জবাবদিহির ঊর্ধ্বে চলে যায়, যখন বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দলীয় আনুগত্যের হাতিয়ারে পরিণত হয়, যখন ভিন্নমত মানেই রাষ্ট্রদ্রোহ বলে বিবেচিত হয়, তখনই ফ্যাসিবাদ জন্ম নেয়। গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ এবং নির্বাচনব্যবস্থার ধ্বংস এর চেনা লক্ষণ।

তাই একটি শাসকের পতনেই ফ্যাসিবাদের অবসান নিশ্চিত হয় না। প্রতিষ্ঠান দুর্বল থাকলে এবং নাগরিক সমাজ নিষ্ক্রিয় হলে নতুন নামে, নতুন চেহারায় কর্তৃত্ববাদ ফিরে আসতে পারে। ফ্যাসিবাদমুক্ত জাতিগঠনের অর্থ তাই এমন একটি রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তোলা, যেখানে কোনো সরকারই, সে যে দলেরই হোক, স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠতে পারবে না। এই কাজে প্রবাসীদের রয়েছে বিশেষ সুবিধা। তাঁরা এমন সব দেশে বাস করেন, যেখানে স্বাধীন বিচার বিভাগ, শক্তিশালী সংসদীয় কমিটি, মুক্ত গণমাধ্যম ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন কীভাবে কাজ করে, তা তাঁরা প্রতিদিন নিজের চোখে দেখেন।

গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের নতুন দিগন্ত

দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটি বড় অংশ জাতীয় নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন ছিলেন। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে প্রথমবারের মতো প্রবাসীদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হওয়া নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক অগ্রগতি। যে মানুষগুলো দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরান, দেশের সংকটে রাজপথে নামেন, তাঁদের কণ্ঠস্বর রাষ্ট্রপরিচালনায় প্রতিফলিত হওয়াই ন্যায়সংগত।

তবে ভোটাধিকার অংশগ্রহণের সূচনামাত্র। প্রবাসে ভোটদান প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, নিরাপদ ও স্বচ্ছ করতে হবে। দ্বৈত নাগরিকদের রাজনৈতিক অধিকার ও দায়িত্বের বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট জাতীয় নীতি প্রয়োজন। সংসদে বা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রবাসীদের প্রতিনিধিত্বের সুযোগ কীভাবে তৈরি করা যায়, সে বিষয়েও খোলামেলা আলোচনা হওয়া উচিত। কারণ, যে জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রের কাছে কোনো জবাবদিহি দাবি করতে পারে না, সেই জনগোষ্ঠী সহজেই কেবল অর্থের উৎসে পরিণত হয়।

ভবিষ্যতে ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধে প্রবাসীদের করণীয়
ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধে প্রবাসীদের প্রথম ও প্রধান ভূমিকা হতে পারে সতর্ক প্রহরীর। দেশে গণমাধ্যম যখন চাপে থাকে, তখন প্রবাসী সাংবাদিক, গবেষক ও মানবাধিকারকর্মীরা স্বাধীনভাবে তথ্য প্রকাশ ও বিশ্লেষণ করতে পারেন। গুম, নির্যাতন কিংবা নির্বাচনী কারচুপির মতো ঘটনা তাঁরা আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরে শাসকদের জবাবদিহির মুখোমুখি করতে পারেন। তবে এই দায়িত্ব পালনে তথ্যের সত্যতা যাচাই অপরিহার্য; গুজব ও অপপ্রচার গণতন্ত্রের জন্য ফ্যাসিবাদের মতোই ক্ষতিকর।
দ্বিতীয়ত, প্রবাসীরা প্রতিষ্ঠান সংস্কারে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দিতে পারেন। বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত আইনবিদ, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, নির্বাচন ব্যবস্থাপনা ও জনপ্রশাসনের অভিজ্ঞ পেশাজীবীরা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, পুলিশ সংস্কার ও দুর্নীতি দমনের কাঠামো নিয়ে মূল্যবান পরামর্শ দিতে পারেন। অন্যান্য দেশে কোন সংস্কার কাজ করেছে আর কোনটি ব্যর্থ হয়েছে, সেই তুলনামূলক অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য দিকনির্দেশক হতে পারে।
তৃতীয়ত, প্রবাসীরা কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের পক্ষে সোচ্চার থাকতে পারেন। যেসব দেশে প্রবাসী বাংলাদেশিরা রাজনীতিতে সক্রিয়, সেখানকার সংসদ ও সরকারের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক বাংলাদেশে মানবাধিকার ও আইনের শাসন রক্ষায় সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। একইভাবে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার ক্ষেত্রেও তাঁদের আইনি জ্ঞান ও স্থানীয় প্রভাব কাজে লাগানো সম্ভব, কারণ দুর্নীতির অর্থই কর্তৃত্ববাদী শাসনের অন্যতম জ্বালানি।
চতুর্থত, প্রবাসী সমাজকে নিজেদের ভেতরেও গণতান্ত্রিক চর্চা নিশ্চিত করতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, দেশের রাজনৈতিক বিভাজন প্রবাসেও হুবহু প্রতিফলিত হয়; দলীয় শাখা-প্রশাখার দ্বন্দ্বে কমিউনিটির ঐক্য বিনষ্ট হয়। ফ্যাসিবাদবিরোধী জাতিগঠনের জন্য প্রবাসী সংগঠনগুলোকে দলীয় লেজুড়বৃত্তির ঊর্ধ্বে উঠে ন্যায়, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
পঞ্চমত, নতুন প্রজন্মকে যুক্ত করা জরুরি। বিদেশে জন্ম নেওয়া ও বেড়ে ওঠা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তরুণেরা অনেক সময় পিতৃপুরুষের দেশের সঙ্গে দূরত্ব অনুভব করেন। তাঁদের কাছে একাত্তর ও চব্বিশের ইতিহাস পৌঁছে দিতে হবে, যাতে তাঁরা বুঝতে পারেন যে স্বাধীনতা ও মর্যাদার জন্য এই জাতি বারবার রক্ত দিয়েছে। এই তরুণেরা তাঁদের শিক্ষা ও নাগরিক চেতনা নিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি রক্ষক হয়ে উঠতে পারেন।

প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা
প্রবাসীদের এই বিপুল সম্ভাবনা বিচ্ছিন্ন উদ্যোগে কাজে লাগানো সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সুসংগঠিত রাষ্ট্রীয় কাঠামো। সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ প্রবাসীদের নিয়ে একটি স্থায়ী পরামর্শক পরিষদ গঠন করতে পারে, যা দলীয় প্রভাবমুক্ত থেকে নীতিনির্ধারণে মতামত দেবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রবাসী বিশেষজ্ঞদের নিয়মিত যোগাযোগের ব্যবস্থা, প্রবাসী বিনিয়োগ ও স্টার্টআপের জন্য সহজ নীতি এবং দূতাবাসগুলোকে সত্যিকার অর্থে প্রবাসীবান্ধব সেবাকেন্দ্রে রূপান্তর করা এখন জরুরি।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে কর্মরত শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষা রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। যে শ্রমিকেরা দেশের জন্য জেল খাটতে প্রস্তুত ছিলেন, তাঁদের প্রতি রাষ্ট্রেরও দায় রয়েছে। অভিবাসন ব্যয় কমানো, প্রতারণা রোধ, আইনি সহায়তা এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করা ছাড়া প্রবাসীদের পূর্ণ অংশীদারত্বের কথা অর্থহীন।

উপসংহার
বাংলাদেশ কেবল ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের একটি ভূখণ্ড নয়। বাংলাদেশের শক্তি ছড়িয়ে আছে বিশ্বের নানা প্রান্তে বসবাসরত কোটি মানুষের শ্রমে, মেধায়, হৃদয়ে ও সাফল্যে। একাত্তরে প্রবাসীরা স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্বজনমত গড়েছিলেন। চব্বিশের জুলাইয়ে তাঁরা তথ্যের অবরোধ ভেঙেছেন, রেমিট্যান্সকে প্রতিবাদের ভাষা বানিয়েছেন, এমনকি বিদেশের কারাগারেও গেছেন। এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে, জাতির প্রতিটি মুক্তিসংগ্রামে প্রবাসীরা ছিলেন সহযোদ্ধা।
এখন সময় এসেছে সেই সহযোদ্ধাদের জাতিগঠনের পূর্ণ অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার। তাঁদের কেবল রেমিট্যান্স পাঠানোর যন্ত্র হিসেবে না দেখে জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, নেতৃত্ব ও গণতান্ত্রিক চেতনার ধারক হিসেবে দেখতে হবে। একটি ফ্যাসিবাদমুক্ত, জবাবদিহিমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়তে দেশের ভেতরের ও বাইরের সব বাংলাদেশির সম্মিলিত শক্তিই হতে পারে সবচেয়ে বড় ভরসা। সেই বৈশ্বিক বাংলাদেশকে জাতিগঠনে কার্যকরভাবে যুক্ত করাই হোক আগামী দিনের অঙ্গীকার।
লেখক: চেয়ারম্যান, কানেক্ট বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল, লন্ডন।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

দুর্গাপূজার নিরাপত্তায় পুলিশ সতর্ক, বিশৃঙ্খলা হলেই ব্যবস্থা ডিআইজি

১

কোটচাঁদপুরে স্কুলে যাওয়ার পথে ৭ম শ্রেণীর ছাত্রী অপহরণ, অভিযুক্ত কালিগঞ্জের ফরহাদ।

২

ফ্যাসিবাদমুক্ত জাতি গঠনে প্রবাসীদের কার্যকর ভূমিকা লেখক: মোহাম্মদ হারুনুর রশিদ

৩

বেনাপোলে পি/স্তল, গু/লি ও ম্যাগাজিনসহ ভ্যান চালক আ/টক

৪

ডিমলায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে উপজেলা প্রশাসনের পরিচ্ছন্নতা অভিযান

৫

কাঁচের টুকরা দিয়ে টাকার কারসাজি! শার্শায় প্রতারণার অভিযোগে গ্রেপ্তার ৩

৬

বালিয়াডাঙ্গায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক সভা ও ৬০টি মশারি বিতরণ

৭

বীরগঞ্জে পরিদর্শন কক্ষের উদ্বোধন শেষে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে__এমপি মজুনরুল ইসলাম মঞ্জু.

৮

কক্সবাজারে রিসোর্টের আগুনে মৃত্যু বেড়ে ১০

৯

ইনানীর ‘টুপটুপ রিসোর্ট’-এ ভয়াবহ আগুন: নিহত ৬, দগ্ধ কয়েকজন

১০

আশুলিয়ায় গাঁজাসহ ১ মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করেছে ডিবি, পিকআপ আটক

১১

পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ গড়তে তরুণদের এগিয়ে আসার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

১২

আশুলিয়ায় সাড়ে ৫ লাখ টাকার জাল নোট উদ্ধার, গ্রেপ্তার ২

১৩

লালমোহনে প্রবাসীর সাড়ে ৫ কোটি টাকা ও স্বর্ণালংকার আত্মসাতের অভিযোগ

১৪

ভোলাহাট সীমান্তে ৫৯ বিজিবি’র অভিযান ৪৩ বোতল নেশাজাতীয় সিরাপ জব্দ

১৫

ফরাজগঞ্জে ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সঙ্গে চেয়ারম্যান প্রার্থী গিয়াস উদ্দিনের মতবিনিময়

১৬

আলোছায়া সমাজ উন্নয়ন সংস্থার উদ্যোগে পুজা উপলক্ষে শাড়ি বিতরণ

১৭

সাভারের পৃথক অভিযানে ইয়াবাসহ তিন মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করেছে ডিবি

১৮

আত্রাইয়ে পুলিশের চেকপোস্টে চোরাই চার্জার অটোরিকশাসহ আন্তজেলা চোর গ্রে/প্তার

১৯

দুর্গাপূজায় ১৩ মণ্ডপে নিরাপত্তা জোরদার করেছে ৫৯ বিজিবি

২০