নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা | ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
ভারতের প্রভাবশালী বাংলা দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা যেন বাংলাদেশের সদ্য সাবেক এবং গণ-আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একনিষ্ঠ মুখপত্র হয়ে উঠেছে। ছাত্র-জনতার তুমুল আন্দোলনের মুখে গত ৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকেই আনন্দবাজার পত্রিকা ধারাবাহিকভাবে শেখ হাসিনার পক্ষে বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে। সম্প্রতি আনন্দবাজারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা দম্ভভরে বলেছেন, তিনি “মাথা উঁচু করে দ্রুত ফিরবেন” এবং প্রয়োজনে “কারাবরণ করতেও প্রস্তুত”। আনন্দবাজারের এই ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশের উদ্দেশ্য এবং তাদের সাংবাদিকতার মানদণ্ড নিয়ে বাংলাদেশের সুশীল সমাজ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
হাসিনার প্রত্যাবর্তন: এক অবাস্তব হুংকার
আনন্দবাজারের ওই প্রতিবেদনে শেখ হাসিনা দাবি করেছেন যে, তিনি ১৯ বার হত্যাচেষ্টার সম্মুখীন হয়েছেন এবং তার দলকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র হয়েছে, কিন্তু থামানো যায়নি। তিনি আরও বলেছেন যে, আওয়ামী লীগের কোটি কোটি সমর্থক এবং লাখো নেতাকর্মী দেশেই রয়েছেন এবং তাদের ফিরে আসা অনিবার্য।
তবে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের পর বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থান বর্তমানে অত্যন্ত নাজুক। দলটির বহু নেতাকর্মী দেশ ছেড়েছেন অথবা আত্মগোপনে আছেন। দেড় লাখের বেশি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার “মাথা উঁচু করে” ফেরার দাবিকে অনেকেই এক অবাস্তব এবং রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা ছাড়া আর কিছুই মনে করছেন না। আনন্দবাজার পত্রিকা কোনো ধরনের বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ ছাড়াই শেখ হাসিনার এই হুংকারকে যেভাবে ফলাও করে প্রচার করছে, তা তাদের সাংবাদিকতার নিরপেক্ষতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
‘কারাবরণে প্রস্তুত’ – একটি সস্তা রাজনৈতিক স্টান্ট?
শেখ হাসিনার “জনতার কল্যাণে কারাবাসের মূল্য দিতেও রাজি” এমন বক্তব্যকে অনেকেই একটি সস্তা রাজনৈতিক স্টান্ট হিসেবে দেখছেন। তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে, দেশে ন্যূনতম গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও আইনের শাসন তৈরি হলেই কেবল আওয়ামী লীগের নেতারা ফিরবেন। অথচ, তিনি যখন ক্ষমতায় ছিলেন, তখন বিরোধী দলগুলোর ওপর কী পরিমাণ দমন-পীড়ন চলেছে, তা কারও অজানা নয়। এখন ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি যখন ‘গণতান্ত্রিক পরিবেশ’ এবং ‘আইনের শাসনের’ কথা বলেন, তখন তা হাস্যকর শোনায়। আনন্দবাজার পত্রিকা এই স্ববিরোধিতাগুলো তুলে না ধরে, বরং তাকে একজন ‘গণতন্ত্রকামী’ নেত্রী হিসেবে তুলে ধরার যে অপচেষ্টা চালাচ্ছে, তা অত্যন্ত নিন্দনীয়।
ভারত-তোষণ এবং আনন্দবাজারের ভূমিকা
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অভিযোগ যে তিনি ভারত-তোষণকারী। আনন্দবাজারের প্রতিবেদনেও এই প্রসঙ্গটি উঠে এসেছে, যেখানে তিনি দাবি করেছেন যে, আওয়ামী লীগ দেশের জনগণের স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছে। কিন্তু ২০১৫ সালের স্থলসীমান্ত চুক্তি বা ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী পাইপলাইনের মতো উদাহরণ টেনে তিনি যে সাফাই গাওয়ার চেষ্টা করেছেন, তা দেশের সাধারণ মানুষের মন জয় করতে পারেনি। আনন্দবাজার পত্রিকা ভারতের একটি সংবাদমাধ্যম হওয়ায়, স্বাভাবিকভাবেই তারা ভারতের স্বার্থের অনুকূলে থাকা একজন নেত্রীকে সমর্থন করবে, এটাই হয়তো তাদের নীতি। কিন্তু একটি স্বাধীন দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে এমন একতরফা এবং পক্ষপাতদুষ্ট প্রতিবেদন প্রকাশ সাংবাদিকতার এথিক্সের পরিপন্থী।
পরিশেষ
আনন্দবাজার পত্রিকার এই ধরনের পক্ষপাতদুষ্ট প্রতিবেদন বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনো ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে না। বরং, এটি বাংলাদেশের মানুষের মনে ভারত এবং ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতি ক্ষোভ ও অবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে তুলবে। একটি দায়িত্বশীল গণমাধ্যম হিসেবে আনন্দবাজারের উচিত সত্যনিষ্ঠ এবং নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশন করা, কোনো বিশেষ ব্যক্তি বা দলের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা নয়। বাংলাদেশের মানুষ এখন অনেক বেশি সচেতন এবং তারা জানেন কোনটি সত্য আর কোনটি প্রোপাগান্ডা। আনন্দবাজার পত্রিকার উচিত এই বিষয়টি অনুধাবন করে তাদের সাংবাদিকতার মান বজায় রাখা।
মন্তব্য করুন