ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে মাত্র কয়েক ঘণ্টার আকস্মিক ভারী বর্ষণেই প্লাবিত হয়েছে বিস্তীর্ণ এলাকা। শুক্রবার (১০ জুলাই) ভোররাতের এই বর্ষণে তলিয়ে গেছে,লাখ লাখ টাকার মৎস্য প্রকল্প। এতে লাখ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছেন স্থানীয় মৎস্য চাষীরা। ভুক্তভোগী ও স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ—প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের একমাত্র প্রধান খালটি অবৈধভাবে বন্ধ করে পুকুর খনন করার কারণেই এই ভয়াবহ ও কৃত্রিম জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা যায়, কোটচাঁদপুরের হরিন্দীয়া ও হাড়ডাঙ্গা বিদ্যাধরপুর মৌজায় বৃহৎ পরিসরে বাণিজ্যিকভাবে মৎস্য চাষ করা হয়। শুক্রবার ভোররাতের মুষলধারে বৃষ্টিতে হরিন্দীয়া গ্রামের মৎস্য চাষী মোঃ পিন্টু মিয়া এবং তাঁর প্রয়াত বড় ভাই মিন্টু মিয়ার সহধর্মিনীর কয়েকটি পুকুর সম্পূর্ণ প্লাবিত হয়। পানির প্রবল বেগে পুকুরের পাড় ও বাঁধ ভেঙে চাষকৃত লাখ লাখ টাকার মাছ ভেসে গেছে বলে দাবি করছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, হরিন্দীয়া মাঠের অতিরিক্ত পানি বিদ্যাধরপুর গ্রামের তালতলা বিল হয়ে সরাসরি কুশনা বাওড়ে চলে যেত। এটিই ছিল এই অঞ্চলের পানি নিষ্কাশনের একমাত্র প্রাকৃতিক মাধ্যম। কিন্তু হরিন্দীয়া ঝামাঘাটা গ্রামের প্রভাবশালী আব্দুর রসিদের পুত্র ইবরাহিম পানি নিষ্কাশনের ওই প্রধান খালের মুখ সম্পূর্ণ বন্ধ করে নিজের সুবিধার্থে একটি নতুন পুকুর খনন করেছেন। সেখানে পানি পাসের কোনো বিকল্প ব্যবস্থা বা কালভার্ট রাখা হয়নি। ফলে ভোররাতের ভারী বর্ষণের পানি মাঠে আটকে যায় এবং তীব্র স্রোতে উল্টো দিকে মৎস্য চাষীদের পুকুরের বাঁধ ভেঙে লণ্ডভণ্ড করে দেয়।
অনুসন্ধানে আরও এক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। হরিন্দীয়া ঝামাঘাটা থেকে প্রায় দেড়-দুই কিলোমিটার দূর থেকে পল্লী বিদ্যুতের মেইন লাইন টেনে পুকুরের চারদিকে উন্মুক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে রেখেছেন অভিযুক্ত ইবরাহীম।
এই মরণফাঁদের কারণে চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় কৃষকরা। ওই পুকুরের আশেপাশে প্রতিদিন স্থানীয় উঠতি বয়সী ছেলেরা মাঠের কাজে যায় এবং গবাদিপশুর জন্য ঘাস কাটতে আসে। যেকোনো মুহূর্তে সেখানে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে বড় ধরনের প্রাণহানি কিংবা গবাদিপশুর দুর্ঘটনার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই বিষয়ে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের তীব্র অবহেলা ও নজরদারির অভাবকে দায়ী করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্য চাষী ও স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন:
“ইবরাহিম খালের মুখ বন্ধ করে পুকুর কাটায় আজ আমাদের এই দশা। পানি বের হওয়ার জায়গা না পেয়ে আমাদের লাখ লাখ টাকার মাছ ভেসে গেছে।এই অবৈধ পুকুর ও খালের মুখ বন্ধকারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”
হাড়ডাঙ্গা বিদ্যাধরপুর গ্রামের কৃষক মোঃ দানেচ আলী বলেন:
“পানির রাস্তা বন্ধ করে অবৈধ পুকুর করার কারণে আমাদের ফসলের এবং মৎস্য চাষীদের ব্যাপক ক্ষতি হয়ে গেল। তার ওপর আবার দূর থেকে বিদ্যুৎ এনে পুকুর ঘিরে রাখা হয়েছে। এতে আমরা মাঠে কাজ করতে ভয় পাচ্ছি। যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। আমরা এর দ্রুত বিচার চাই।”
জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ
একটি মাত্র প্রভাবশালী মহলের অবৈধ ও স্বার্থান্বেষী কর্মকাণ্ডের কারণে আজ হরিন্দীয়া শত শত কৃষক ও মৎস্য চাষী চরম অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। একই সাথে ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যুৎ সংযোগের কারণে সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন।
স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগী কৃষকরা এই কৃত্রিম জলজট নিরসন, খাল উদ্ধার এবং ঝুঁকিপূর্ণ অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে ঝিনাইদহের বিজ্ঞ জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং কোটচাঁদপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মহোদয়ের আশু হস্তক্ষেপ ও জরুরি দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন। পরিবেশ ও কৃষকদের বাঁচাতে এই অবৈধ পুকুর উচ্ছেদ ও দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
মন্তব্য করুন