সিনেমা এমন মাধ্যম, যার বৈশিষ্ট্যই হলো মাল্টিলেয়ার্ড। সেই অর্থে ‘দম’ একটি বহুমাত্রিক চলচ্চিত্র। এর কেন্দ্রীয় স্তরগুলোতে আছে কালচারাল রিলিজন, পলিটিকাল রিলিজন ও তার বৈশ্বিক রাজনীতির জটিল অংকের মারপ্যাচ। এই রাজনীতির খেলায় কেউই যে একেবারে নির্দোষ, তা বলা কঠিন। ফলে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত একজন তরুণও নিজের দেশকে রক্ষার তাগিদে তালেবান হয়ে ওঠাকে যৌক্তিক মনে করতে পারে— বাজারি অর্থনীতিতে অস্ত্রব্যবসা গোটা সিস্টেমটার এথিকাল স্ট্যান্ডার্ড যখন ঠিক করে দেয়, তখন সাধারণ মানুষের পক্ষে ভালো-খারাপের প্রশ্নে টিকচিহ্ন দেয়া অদ্ভুতুড়ে বিষয়ে পরিণত হয়।
‘দম’ এমন এক গল্প, যেখানে পেন্টাগনের একটি সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের এক অজপাড়া গাঁয়ের সাধারণ, গর্ভবতী এক তরুণীর জীবন ওলটপালট করে দেয়। একটি ঢিল পুকুরে ছুড়ে মারলে তরঙ্গ যেমন একসময় প্রান্তসীমায় ছড়িয়ে পড়ে, ঠিক তেমনি আমেরিকা যেন দুনিয়ার একদম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। সেখানকার ‘মাথা মাথা’ লোকের সিদ্ধান্তে নির্ধারিত হয় আফ্রিকার কোনো দেশে নতুন করে দুর্ভিক্ষ হবে কিনা! বাংলাদেশ বা শ্রীলংকার কোনো তরুণ মিছিলে যাবে কিনা! আর এসব ডামাডোলে প্রভাবিত, নিহত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমন সব মানুষ, যারা চিরকালই হিসাবের বাইরের লোক। যাদের এমনকি তার পরিবারের প্রধান সদস্যটিও গুরুত্বপূর্ণ ভাবে না!
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর অলিখিত ‘ভাতার’ হিসেবে দেখা হলেও দমের ন্যারেটিভ শেষ পর্যন্ত অন্য এক সুপারপাওয়ারের উপস্থিতির ইঙ্গিত দেয়। ‘সামওয়ান কল্ড সামওয়ান’– মন্ত্রী আসলে কাকে ফোন দিয়েছিল? এই সংকটময় মুহূর্তে ‘ভাতার’কে পাশ কাটিয়ে কাকে ঘরে ঢোকাতে হলো? প্রশ্নগুলো ইচ্ছাকৃতভাবেই অমীমাংসিত থেকে যায় সিনেমায়।
গল্পে ১৯৭১ প্রসঙ্গ বারবার ফিরে আসে– এটি নিছক নস্টালজিয়া নয় বরং পরিচয় নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এই সূত্র ধরে এগোলে বোঝা যায়, বাংলাদেশের মুসলমান পরিচয় কীভাবে পাকিস্তানি বা তালেবানি ইসলামের থেকে নিজেকে আলাদা করে। সাংস্কৃতিক পার্থক্যের এই জায়গায় চলচ্চিত্রটি নিজের কোমলতা ও মানবিকতা তুলে ধরে। সিনেমার কাহিনীকার তালেবানদের একেবারে কট্টরভাবে উপস্থাপন করলেও তাদের পুরোপুরি ডিহিউমানাইজ করেনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দমের খেলায় চূড়ান্ত হিসাব নিকাশে পাকিস্তানই ভিলেন বা প্রতিপক্ষ হিসেবে থেকে গেছে।
অন্যদিকে, সুজিত ও নূরের সম্পর্ক বাঙালি মুসলমান ও বাঙালি সনাতনীর সহাবস্থানের বাস্তবতা নির্মাণ করে। এই নির্মাণটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে এই সময়ে এসে, যখন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বাস্তবতায় ধর্মীয় মেরুকরণ ক্রমশ দৃশ্যমান। মাজার ভাঙা, ফকিরি-সহজিয়া সংস্কৃতির ওপর আক্রমণ এবং শিক্ষিত মধ্যবিত্তের একটি বড় অংশের সাংস্কৃতিক চর্চাকে ‘ভারতঘেঁষা’ বলে আখ্যা দেওয়ার প্রবণতা থেকে ছায়ানট, উদীচী, ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোতে আক্রমণ চালানো হয়।
বাংলাদেশের ধর্মীয় রাজনীতির ন্যারেটিভে এই সময় মুসলমান পুরুষকে প্রথম সারির নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়, যেখানে নারী ও অন্যান্য ধর্মীয় পরিচয়কে দ্বিতীয় সারিতে ঠেলে দেওয়া হয়। ঠিক এই সময় বাংলাদেশের চরকি ও ভারতের এসভিএফের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি। চঞ্চল চৌধুরীকে সাপোর্টিং রোলে এনে আফরান নিশোকে কেন্দ্রে আনা– সম্ভবত সময়ের প্রেক্ষাপটেই এই সিদ্ধান্ত। ফলে দম শুধুমাত্র বিনোদনের উপকরণ নয়, এটি দক্ষিণ এশীয় রাজনীতি ও সেই রাজনীতির ভাবাদর্শ নির্মাণে সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। টেকনিক্যাল দিক থেকেও চলচ্চিত্রটি শক্তিশালী– গল্প, চরিত্র নির্মাণ, সংলাপ, মিজ-অঁ-সিন; সব মিলিয়ে দারুণ।
আমাদের সংস্কৃতিতে ‘ফেরা’ একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। দিন শেষে জীবনসঙ্গীর কাছে ফিরে আসা, প্রাত্যহিক দুনিয়াবি কাজ সেরে ফিরে আসা, উৎসবের সময় ফিরে আসা গুরুত্বপূর্ণ। একটি সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার পর নিজের দেহ-মন আর পুরোপুরি নিজের থাকে না, তা অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। এই সমর্পণের ভেতরেই সম্পর্কের গভীরতা। তাই নূরের জন্য ‘ফেরা’ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে; নিজের জন্য নয়, রানীর জন্য। রানী এখানে নূরের আরাধ্য। শারীরিক নিগ্রহ, বন্দিদশা– এসব কিছু ছাপিয়েও নূরের কাছে প্রধান হয়ে ওঠে রানীর জন্য বেঁচে থাকা, বেঁচে ফেরা। যেন নূরের শরীর বা আত্মা ঠিক নূরের নয়। একটা দৃশ্যে দেখা যায়– রানী তার বরকে বিদেশে যেতে দিতে চায় না, সেখানে অন্য নারীদের সাথে নূরের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার ভয় পায় রানী। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের যে কাঠামো এখানে দেখানো হয়েছে, সেখানে টিপিকাল নারী-পুরুষের ক্ষমতা কাঠামোর বাইরে রানীকে অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ-সাবলীল-সক্রিয় দেখানো হয়েছে। ঘরের বৌয়ের দাম্পত্য সম্পর্ক নির্মাণে নারীকে বাংলাদেশের সিনেমায় এর আগে এতোটা সক্রিয় খুব কম সিনেমাতেই উঠে এসেছে।
এই বিপ্লব, বন্দিদশা, ইসলাম; এ ধরনের ছবির কথা উঠলেই এই অঞ্চলের সিনেমাপ্রেমীদের কাছে মণিরত্নমের ‘রোজা’ সিনেমাটার কথাই মনে আসবে। কিন্তু আমার বারবার ‘দিল সে’র কথা মনে পড়ছিল। নায়িকা মেঘনার প্রতি নায়ক আমরের যে টান বলা ভালো তা যেন রাধাভাব– মণিরত্নম কী সুতীব্রভাবে তুলে ধরেন– যেখানে প্রেমের জন্য রাষ্ট্র-সার্বভৌমত্ব সবকিছুর বিরুদ্ধেও দাঁড়ানো যায়। ‘দম’-এ আমরা দেখি, সুজিত সহজেই জীবন বাজি রাখতে পারে। কারণ, তার জন্য দেশে কেউ অপেক্ষা করে না। কিন্তু নূরের জন্য ৫৩ দিন বা তারও বেশি বেঁচে থাকার দায় থেকে যায়, সে এখন অন্য কারও আমানত। অর্থাৎ, আমি দেখতে চেয়েছি– সব কিছুর ঊর্ধ্বে গিয়ে মানব-মানবীর প্রেমে কীভাবে পরমের সন্ধান খুঁজে নেয়। কিংবা চরম জৈবিক তাড়না বা ‘লিবিডো’ কীভাবে নূরকে বেঁচে থাকার ব্রিদিং স্পেস দেয়, তাকে দুনিয়াবি খেলায় টিকিয়ে রাখে।
ড্যানি বয়েলের ‘ওয়ান টোয়েন্টি সেভেন আওয়ার্স’-এর সঙ্গে দম পড়ে দেখতে আরও আকর্ষণীয় লাগে– দুটোই যেহেতু সারভাইভাল জঁরার। সেখানে পাথুরে পরিবেশে আটকে পড়া এক মানুষের গল্প। অ্যারনের বেঁচে থাকার সারভাইভাল মেকানিজম হয়ে দাঁড়ায় এই লিবিডো। ক্যানিওনে আটকে পড়ে প্রবল হ্যালুসিনেট করতে থাকে অ্যারন। এই প্রবল দুঃসহ একাকিত্ব ভয়কে জয় করে তার লিবিডো। ক্রমাগত সদ্য পরিচিত দুজন তরুণীর সঙ্গে সম্ভাব্য সম্পর্কের কল্পনা তাকে বাঁচিয়ে রাখে। ঠিক তেমন ক্রাফটিং দমেও দেখা যায়। রানীর বোনা সোয়েটার তাকে উষ্ণতা দেয়, নিভৃত গুহায় নূরের কল্পনার সুড়ঙ্গ ধরে চলে আসে, নরম ফুঁয়ে জখম সারিয়ে তোলে– এইসব হ্যালুসিনেশন তাকে মৃত্যুর মুখেও আশার খড়কুটোটি আঁকড়ে থাকতে সাহায্য করে।
ফলে ‘দম’ যেই অর্থে টেকনিক্যালি সাউন্ড, তেমনি গল্পটিও চমৎকার এগিয়ে যায়। তবে গল্পের পলিটিক্যাল ন্যারেশন নিয়ে বাহাস তৈরি হবে। এটা ভারতীয় ন্যারেশন হল কিনা, কী হলে বাংলাদেশের জন্য যথার্থ ন্যারেশন হতো– তা নিয়ে তর্কবিতর্ক জমে উঠবে, এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। তবে আমি দেখতে চেয়েছি, দমে কতখানি মানুষ উঠে এলো। সিনেমা শেষে মনে হয়েছে, হয়তো আরও উঠে আসতে পারতো। ‘ওয়ান টোয়েন্টি সেভেন আওয়ার্স’-এর সাথে তুলনা করলে মনে হবে— বন্দিদশার সংকট, ভীতি কিংবা অসহায়ত্ব আরও তুলে আনতে পারতো। হয়তো তাতে সিনেমা আরও জমে যেতে পারতো। তবু বলব, ‘দম’ একটা অসাধারণ চেষ্টা। এতো বড় একটা প্রজেক্ট ঠিকঠাকমতো তুলে আনা, আমরা কয়েক বছর আগেও কি ভাবতে পেরেছি!
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়
মন্তব্য করুন