নিজস্ব প্রতিবেদক :
দৈনিক কালবেলার গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি সাংবাদিক মহিন উদ্দিন রিপনের ওপর হামলা, অপহরণ, শারীরিক নির্যাতন, এক কোটি টাকা চাঁদা দাবি ও ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগের প্রতিবাদে গাজীপুরের টঙ্গীতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সোসাইটি অব জাতীয় গণমাধ্যম কমিশনের কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত এ মানববন্ধন থেকে ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত, মামলার সব আসামিকে দ্রুত গ্রেপ্তার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং সাংবাদিক ও তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে দেশব্যাপী বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) দুপুরে টঙ্গী সরকারি হাসপাতালের সামনে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিভিন্ন সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ অংশ নেন।
সোসাইটি অব জাতীয় গণমাধ্যম কমিশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি এ কে এম আজিজুল হকের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক কালিমুল্লাহ ইকবালের সঞ্চালনায় মানববন্ধনে বক্তব্য দেন সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক সাহাদাত হোসেন কামাল খান, বিএনপি নেতা বি এম শামীম, গাজীপুর সেন্ট্রাল ক্লাবের সভাপতি আব্দুল ওহাব রিঙ্কু, গাজীপুর মিডিয়া ক্লাবের সভাপতি মাহবুবুর রহমান জিলানী, বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের সাধারণ সম্পাদক মো. নাজমুল বারী চৌধুরী, সহসভাপতি আব্দুর রহমান ও সাংগঠনিক সম্পাদক সফিউদ্দিন খান।
এ ছাড়া বক্তব্য দেন গাজীপুর রিপোর্টার্স ক্লাবের সভাপতি আবুল বাশার পলাশ, জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন ওয়েলফেয়ারের কেন্দ্রীয় সভাপতি গাজী মামুন, ইনফো টেলিভিশনের সম্পাদক আওলাদ হোসেন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন টঙ্গী পূর্ব থানার যুগ্ম আহ্বায়ক মোক্তার হোসেন এবং টঙ্গী রিপোর্টার্স ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক কামরুল হাসান শাহা।
সংগঠনের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক মনির হোসেন চৌধুরী, সহসভাপতি এস এম কামাল ও সিকান্দার আনন্দ, সহসাধারণ সম্পাদক রুম্মান শেখ ও ইসমাইল হোসেন, সহসাংগঠনিক সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম ও মাহবুব আলম জুয়েল, দপ্তর সম্পাদক নজরুল ইসলাম এবং অর্থ সম্পাদক মামুন আহমদ ফিরোজ।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন দৈনিক যায়যায়দিনের টঙ্গী প্রতিনিধি রেজাউল কবির রাজীব, সিনিয়র সাংবাদিক মো. পাপেল মিয়া, সাংবাদিক মামুন হাসান, সুজন সারওয়ার, পারভীন ইতি, মো. আনু হাসান, মহুয়া, মোহাম্মদ শামীম রেজা, হানিফ মিয়া, মামুন আহসান, মো. খোকন মিয়া, জসীম উদ্দীন জুয়েলসহ বিভিন্ন সাংবাদিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, একজন পেশাদার সাংবাদিককে সংবাদ প্রকাশের কারণে অপহরণ, নির্যাতন, চাঁদা দাবি কিংবা ব্যক্তিগত সম্মানহানির হুমকি দেওয়া স্বাধীন সাংবাদিকতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্য অশনিসংকেত। সাংবাদিকরা সমাজের অপরাধ, দুর্নীতি, মাদক কারবার ও অনিয়মের চিত্র তুলে ধরেন। কারও স্বার্থে আঘাত লাগলে আইনগত প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু কোনো সাংবাদিককে অপহরণ করে নির্যাতন কিংবা প্রাণনাশের চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক সাহাদাত হোসেন কামাল খান বলেন, সাংবাদিকের কলম স্তব্ধ করে অপরাধ আড়াল করার অপচেষ্টা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। এ ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তাদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি ভুক্তভোগী সাংবাদিক ও তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
মানববন্ধনে সাধারণ সম্পাদক কালিমুল্লাহ ইকবল বলেন, “সাংবাদিকতা কোনো অপরাধ নয়; বরং সমাজের অপরাধ, অনিয়ম ও দুর্নীতি তুলে ধরাই সাংবাদিকদের দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একজন সাংবাদিক যদি অপহরণ, নির্যাতন, চাঁদাবাজি কিংবা ব্ল্যাকমেইলের শিকার হন, তাহলে তা শুধু একজন ব্যক্তির ওপর হামলা নয়, স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর সরাসরি আঘাত। আমরা কোনো বিশেষ সুবিধা চাই না; চাই সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার। মহিন উদ্দিন রিপনের ঘটনায় অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে তাঁর ও পরিবারের নিরাপত্তা দিতে হবে। অপরাধী যে-ই হোক, তাকে আইনের ঊর্ধ্বে থাকার সুযোগ দেওয়া যাবে না।”
কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি এ কে এম আজিজুল হক বলেন, “সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে সত্য প্রকাশের অধিকার এবং সাধারণ মানুষের তথ্য জানার অধিকার সুরক্ষিত করা। একজন সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনায় নীরব থাকার সুযোগ নেই। এ ঘটনায় দৃশ্যমান আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ এবং প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার কোনো বিকল্প নেই।”
বক্তারা আরও বলেন, সাংবাদিক মহিন উদ্দিন রিপনের দায়ের করা মামলায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও অন্য আসামিরা এখনো গ্রেপ্তার হয়নি। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মামলার বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় টঙ্গী ও গাজীপুরের গণ্ডি পেরিয়ে সারা দেশের সাংবাদিক সমাজ ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনকে সঙ্গে নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
অপহরণ, নির্যাতন ও এক কোটি টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ
মামলার বাদী সাংবাদিক মহিন উদ্দিন রিপনের অভিযোগ, গত ২৬ অক্টোবর দুপুরে গাজীপুরের টঙ্গী সেনা কল্যাণ শপিং কমপ্লেক্সের মাজার বস্তির হোন্ডা রোড এলাকা থেকে একদল ব্যক্তি অস্ত্রের মুখে তাঁকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়। পরে টঙ্গীর হাজী মাজার বস্তি এলাকার একটি স্থানে আটকে রেখে মারধর ও শারীরিক নির্যাতন করা হয়।
রিপনের অভিযোগ, মাদক ব্যবসা, অপরাধী চক্র ও সন্ত্রাসবিরোধী সংবাদ প্রকাশের জের ধরে পরিকল্পিতভাবে তাঁকে অপহরণ করা হয়। অপহরণের পর তাঁকে আটকে রেখে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। এ সময় দেশীয় অস্ত্র দিয়ে মারধরের পাশাপাশি ধারালো অস্ত্র দিয়ে জবাই করে হত্যার চেষ্টা করা হয়। প্রায় তিন ঘণ্টা পর স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় তিনি উদ্ধার হন। পরে তাঁকে টঙ্গীর একটি সরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়।
এ ঘটনায় মহিন উদ্দিন রিপন বাদী হয়ে টঙ্গী পশ্চিম থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় অপহরণ, মারধর, শারীরিক নির্যাতন, এক কোটি টাকা চাঁদা দাবি ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে। পুলিশ ইতিমধ্যে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে। অন্য আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
টঙ্গী পশ্চিম থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আরিফ হোসেন বলেন, এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। ইতিমধ্যে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযানের দাবি
সাংবাদিক রিপনের অভিযোগ, টঙ্গীর হাজী মাজার বস্তি ও তুরাগ নদসংলগ্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক কারবারি, ছিনতাইকারী ও বিভিন্ন অপরাধী চক্রের তৎপরতা নিয়ে তিনি সংবাদ প্রকাশ করে আসছিলেন। এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের তথ্য তুলে ধরার কারণেই তাঁকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়ে থাকতে পারে বলে তাঁর ধারণা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, হাজী মাজার বস্তি ও আশপাশের কিছু এলাকায় মাদক কেনাবেচা, ছিনতাই এবং বিভিন্ন অপরাধী চক্রের তৎপরতা রয়েছে। বিশেষ করে নদীতীরবর্তী নির্জন স্থান ও কিছু সড়কে সন্ধ্যার পর সাধারণ মানুষের চলাচলে আতঙ্ক বিরাজ করে। মাঝেমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান পরিচালিত হলেও অপরাধীদের তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে দাবি তাঁদের।
স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা অপরাধীদের পাশাপাশি এসব কর্মকাণ্ডের নেপথ্যে থাকা অর্থের জোগানদাতা, আশ্রয়দাতা ও নিয়ন্ত্রণকারীদেরও শনাক্ত করার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে হাজী মাজার বস্তি ও আশপাশের এলাকায় মাদক ও ছিনতাইবিরোধী বিশেষ অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি এবং নিয়মিত পুলিশি টহল জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
উল্লেখ্য, সাংবাদিক রিপনের ওপর হামলা ও অপহরণের প্রতিবাদে গত ২৭ অক্টোবর বিকেলে গাজীপুর মিডিয়া সেন্টারে সাংবাদিকদের উদ্যোগে আরও একটি মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। ওই কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন সংবাদ সংস্থা এনএনবির সম্পাদক ও কলামিস্ট জুলিয়াস চৌধুরী। সেখানেও ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত, জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
শনিবারের মানববন্ধন থেকে বক্তারা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, সাংবাদিক মহিন উদ্দিন রিপনের ওপর হামলা ও অপহরণের ঘটনার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত প্রতিবাদ অব্যাহত থাকবে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মামলার বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে কার্যকর অগ্রগতি না হলে দেশব্যাপী বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। তাঁদের দাবি, সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু সাংবাদিক সমাজের দাবি নয়, এটি সত্য প্রকাশ ও জনগণের জানার অধিকার রক্ষারও লড়াই।
মন্তব্য করুন