সায়মন খান | লিড নিউজ ২৪:
বলিউড অভিনেতা টাইগার শ্রফের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণের ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছেন অনিল পণ্ডিত নামের এক ব্যক্তি। ভারতের কুখ্যাত লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। ভারতীয় পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, একসময় অপরাধজগতে তেমন পরিচিতি না থাকা এই ব্যক্তি এখন বিদেশে বসেই ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে চাঁদাবাজি, হত্যার হুমকি ও সশস্ত্র হামলার পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
রোববার (১৮ অক্টোবর) সন্ধ্যায় মুম্বাইয়ের জুহু এলাকায় বলিউড অভিনেতা টাইগার শ্রফের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালায় মোটরসাইকেলে আসা তিন দুর্বৃত্ত। হামলায় অভিনেতা প্রাণে বেঁচে গেলেও তাঁর গাড়িচালকসহ দুজন আহত হন। ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিও বার্তায় নিজেকে অনিল পণ্ডিত পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তি হামলার দায় স্বীকার করেন। একই সঙ্গে বলিউডের অন্য তারকাদেরও হুমকি দেওয়া হয়।
তদন্তকারীদের তথ্য অনুযায়ী, অনিল পণ্ডিতের বাড়ি ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের পানিপত জেলার রাই কালান গ্রামে। বয়স আনুমানিক ৩০ থেকে ৩২ বছর। ২০২৩ সালে ভারত ছাড়ার আগে তাঁর বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য কোনো অপরাধের রেকর্ড ছিল না। তবে বিদেশে যাওয়ার পর ধীরে ধীরে তিনি সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন বলে পুলিশের ধারণা।
ভারতীয় তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, প্রথমে কানাডায় এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রে যান অনিল। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া থেকে অপরাধচক্রের কার্যক্রম সমন্বয় করছেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। বিদেশে অবস্থান করেও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসায়ী, শিল্পী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি এবং হামলার পরিকল্পনার সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।
পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের সক্রিয় সদস্য হিসেবে পরিচিত হরমন সান্ধু, হ্যারি বক্সার, শুভম লোনকর ও রণদীপ মালিকের সঙ্গে অনিল পণ্ডিতের যোগাযোগ রয়েছে। তাঁদের সহযোগিতায় দেশের বাইরে থেকে চাঁদাবাজির কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তদন্তকারীদের।
শুধু টাইগার শ্রফের ওপর হামলার ঘটনাই নয়, চলতি বছরের ১১ জুন পশ্চিম দিল্লিতে পাঞ্জাবি সংগীতশিল্পী গুরু রানধাওয়ার মালিকানাধীন একটি জিমের বাইরে গুলিবর্ষণের ঘটনায়ও অনিল পণ্ডিতের নাম উঠে আসে। ওই ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হামলার দায় স্বীকার করেছিলেন বলে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।
একইভাবে হরিয়ানার ভিওয়ানি এলাকায় জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী দিলের খাড়কিয়ার গাড়ি লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণের ঘটনাতেও তাঁর সংশ্লিষ্টতা সন্দেহ করছেন তদন্তকারীরা। অভিযোগ রয়েছে, চাঁদার দাবি কিংবা অপরাধচক্রের নির্দেশ অমান্য করায় এসব হামলা চালানো হয়েছে।
এ ছাড়া দিল্লির ব্যবসায়ী ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিচিত মুখ মনীশ জৈনের কাছে পাঁচ কোটি রুপি চাঁদা দাবির অভিযোগও রয়েছে অনিলের বিরুদ্ধে। দাবি অনুযায়ী অর্থ না দিলে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
ভারতীয় পুলিশের তথ্যমতে, পানিপত, সোনিপত ও কর্ণালের একাধিক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে চাঁদা দাবির ঘটনায় অনিল পণ্ডিতের বিরুদ্ধে প্রায় ১০ থেকে ১২টি মামলার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। কয়েকটি ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয়েছে।
তদন্তকারীদের ধারণা, অপরাধচক্রটি বিদেশ থেকে এনক্রিপ্টেড যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে ভারতের স্থানীয় সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। হামলার লক্ষ্য নির্ধারণ, অস্ত্র সংগ্রহ, নজরদারি এবং হামলাকারীদের নির্দেশ দেওয়ার কাজ বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগ করে পরিচালিত হয়। এতে মূল পরিকল্পনাকারীরা বিদেশে অবস্থান করেও সরাসরি অপরাধ সংঘটনের ঝুঁকি এড়িয়ে যেতে পারেন।
এদিকে টাইগার শ্রফের গাড়িতে গুলির ঘটনায় তিন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। হামলার পর প্রকাশিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট ও অডিও বার্তার সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের সঙ্গে অনিল পণ্ডিত ও বিষ্ণোই গ্যাংয়ের যোগাযোগের বিষয়টিও তদন্তাধীন।
অডিও বার্তায় সালমান খানের সঙ্গে কাজ করা বলিউড তারকাদের উদ্দেশে হুমকি দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সালমান খানকে কেন্দ্র করে লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের বিরোধ ও হুমকির ঘটনা আলোচনায় রয়েছে। নতুন করে টাইগার শ্রফের ওপর হামলার পর সেই আতঙ্ক আরও বেড়েছে।
ভারতীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে এখন বড় চ্যালেঞ্জ বিদেশে অবস্থানকারী সন্দেহভাজন অপরাধচক্রের সদস্যদের শনাক্ত করা এবং তাঁদের বিচারের আওতায় আনা। অনিল পণ্ডিতকে ভারতে ফিরিয়ে আনার সম্ভাব্য আইনি প্রক্রিয়াও খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত বিচারিক নিষ্পত্তি হয়নি। হামলার দায় স্বীকারের দাবিসংবলিত বার্তাগুলোর প্রকৃত উৎস এবং অপরাধচক্রের সঙ্গে তাঁর সরাসরি সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
মন্তব্য করুন