ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বুধবার জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল তাঁর দেশের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরুর পর জাতিসংঘে এটিই ছিল তাঁর প্রথম ভাষণ। তিনি বলেছেন, তেহরান কখনো ‘মাথা নত করবে না।’
সংঘাত শুরুর সময় ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার জন্য পেজেশকিয়ান ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসবাদের’ অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, ইরান কখনো কোনো যুদ্ধ শুরু করেনি।
জাতিসংঘ থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
মঙ্গলবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, তিনি ইরানকে ‘নিশ্চিহ্ন’ করার বিষয়টি বিবেচনা করছেন। তবে একই ভাষণে তিনি তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে পুনরায় শুরু হওয়া আলোচনার প্রশংসা করেন।
তবে, পেজেশকিয়ান তাঁর কঠোর ভাষণে স্থবির হয়ে পড়া যুদ্ধ অবসানে চলমান আলোচনার কোনো উল্লেখ করেননি।
তিনি বলেন, ‘ট্রাম্পকে অবশ্যই জানতে হবে, নিষেধাজ্ঞা, বাড়তি চাপ ও ক্রমবর্ধমান হুমকির মুখে ইরানি জনগণের প্রতিরোধ আরও বাড়বে। আমরা কখনো মাথা নত করব না বা হাঁটু গেড়ে বসব না।’
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান হরমুজ প্রণালীতে চলাচল কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে। এতে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে। পেজেশকিয়ান বলেন, হরমুজ প্রণালীকে তাঁর দেশের বিরুদ্ধে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ তেহরান দেবে না।
তিনি বলেন, ‘আমরা এটা হতে দিতে পারি না যে কেউ এই জলপথে অবাধে চলাচল করে নিজেদের স্বার্থ জোরদার করবে, আবার একই জলপথ ব্যবহার করে আমাদের ওপর আগ্রাসন চালাবে।’
ম্যানহাটনের প্রাণকেন্দ্রে জাতিসংঘের এই গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক আয়োজনে পেজেশকিয়ানের অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র তাঁকে ভিসা দেবে কি না, তা স্পষ্ট ছিল না।
শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন তাঁকে ভিসা দেয়। তবে পেজেশকিয়ানের সফরসঙ্গীদের কয়েকজনকে ভিসা দেওয়া হয়নি।
জ্বালানির দাম ব্যাপক বেড়ে যাওয়ায় নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট যুদ্ধের অভ্যন্তরীণ প্রভাবকে গুরুত্বহীন হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছেন।
-কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ইউক্রেন-
এদিকে বুধবার জাতিসংঘে বিশ্বনেতাদের বার্ষিক সমাবেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎও গুরুত্ব পায়।
নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে এমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি নিয়ে বিশ্বজুড়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে শিরোনাম হওয়ার পর এবং এর উন্নয়নে গতি কমানোর আহ্বানের মধ্যে প্রযুক্তি খাতের নেতারা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে বিষয়টি অবহিত করেন। তাঁরা আরও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্যাম অল্টম্যান বলেন, ‘এই মুহূর্তে চরম সতর্কতার প্রয়োজন।’
অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই বলেন, নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা বাজারে আনার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যেখানে প্রয়োজন, সেখানে গতি কমানো হবে।
মঙ্গলবারের ভাষণে ট্রাম্প কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান করেন। এ ধরণের প্রস্তাবকে তিনি ‘বৈশ্বিকতাবাদীদের ষড়যন্ত্র’ বলে অভিহিত করেন।
এদিকে, বুধবার জাতিসংঘে ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধের বিষয়টিও উঠে আসে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি অভিযোগ করেন, রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন মস্কোর যুদ্ধ চালিয়ে যেতে ৪৭টি দেশের যোদ্ধাদের ব্যবহার করছেন। ২০২২ সালে রাশিয়ার আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে এই যুদ্ধ শুরু হয়। এরই মধ্যে চার বছর ধরে রক্তক্ষয়ী সংঘাত চলছে।
জেলেনস্কি আরও সতর্ক করে বলেন, আসন্ন শীতে তাঁর বাহিনী রাশিয়ার উত্তাপ ও জ্বালানি স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে মস্কো যেভাবে এই অঞ্চলের তীব্র শীতকে কাজে লাগিয়েছে, তার জবাবে এমন পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
তিনি জাতিসংঘে বলেন, ‘ইউক্রেনীয়রা বুঝতে পারছে, এই শীত আমাদের জন্য খুব কঠিন হতে পারে। তবে এর জবাবে রাশিয়ার জন্যও পরিস্থিতি কঠিন করে তোলা ছাড়া আমাদের কোনো উপায় থাকবে না।’
‘কখনো কোনো নারী নেতৃত্বে ছিলেন না’-
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে জাতিসংঘের নেতৃত্বে একজন ল্যাটিন আমেরিকান নারীকে নির্বাচিত করার আহ্বান জানান।
সানচেজ বলেন, ‘যে সংস্থা সমগ্র মানবতার হয়ে কথা বলার দাবি করে, সেখানে কখনো কোনো নারী নেতৃত্বে ছিলেন না—এটা কীভাবে সম্ভব?’ তিনি আরও বলেন, জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মহাদেশেরও এই দায়িত্ব পাওয়ার সময় অনেক আগেই হয়েছে।
পর্তুগালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আগামী ৩১ ডিসেম্বর দায়িত্ব ছাড়বেন। তাঁর উত্তরসূরি হতে চার নারী ও তিন পুরুষ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁদের মধ্যে ল্যাটিন আমেরিকার কয়েকজন প্রার্থীও রয়েছেন।
মন্তব্য করুন