বিশেষ সম্পাদকীয় প্রতিবেদন
ঢাকা: ৫ই আগস্ট—বাঙালির রাজনৈতিক ও জাতীয় ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ও অবিস্মরণীয় মাইলফলক, যা রাজপথের উত্তাল লড়াইয়ে রূপ নিয়েছিল সংগ্রামের চিরভাস্বর দিন ‘৩৬ জুলাই’-এ। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চেপে বসা ফ্যাসিবাদী দুঃশাসন, নিপীড়ন ও ভোটাধিকার হরণের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার রক্তস্নাত গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়েছিল এই ঐতিহাসিক বিজয়। স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর এই দিনটি কেবল অতীতের একটি তারিখ হিসেবে নয়, বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে চিরন্তন প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
আজকের এই বিশেষ দিনে দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল, নবগঠিত রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টারা ফ্যাসিবাদের পুনরাবৃত্তি রোধে এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে তাঁদের দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করেছেন।
ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক শীর্ষ নেতৃত্বের বক্তব্য
৩৬ জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করে দেশের রাজনীতিতে ফ্যাসিবাদের চিরতরে অবসান ঘটানোর যে সর্বজনীন ডাক উঠেছে, তা আজকের দিনে বিভিন্ন স্তরের নেতাদের বক্তব্যে সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে:
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)
বিএনপির পক্ষ থেকে এই দিনটিকে গণতন্ত্রের নবপ্রভাতের দিন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। দলের দায়িত্বশীল প্রতিনিধিরা বলেন:
> “৫ই আগস্ট বা ৩৬ জুলাই কেবল একটি বিশেষ দলের বা গোষ্ঠীর একক অর্জন নয়; এটি দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে চলা ফ্যাসিবাদী অপশাসন, গুম, খুন ও গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের বিরুদ্ধে সমগ্র জাতির পুঞ্জীভূত ক্ষোভের মহাবিস্ফোরণ। এই গণআকাঙ্ক্ষাকে ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না। ফ্যাসিবাদী কাঠামোর মূলোৎপাটন করে জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা ও আইনের শাসন সুনিশ্চিত করাই আজকের দিনের প্রধান অঙ্গীকার।”
>
জাতীয় নাগরিক পার্টি (NCP)
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের চেতনায় গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (NCP) রাজনৈতিক ব্যবস্থার আমূল সংস্কার ও ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান রোধে জোর তাগিদ দিয়েছে। দলটির শীর্ষ নেতাদের ভাষ্য:
> “৩৬ জুলাইয়ের ঐতিহাসিক রক্তদান স্রেফ ক্ষমতার রদবদলের জন্য ছিল না, বরং তা ছিল একনায়কতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রযন্ত্রের চিরতরে বিলোপ ঘটানোর লড়াই। যদি রাষ্ট্রকাঠামোর মৌলিক রূপান্তর না ঘটে এবং ফ্যাসিবাদের দোসরদের উপযুক্ত বিচার নিশ্চিত না হয়, তবে শহীদদের রক্ত বৃথা যাবে। আমাদের লক্ষ্য একটি নতুন গণতান্ত্রিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে কোনো ব্যক্তি বা দল আর কখনো স্বৈরাচারী হতে পারবে না।”
>
সাবেক উপদেষ্টাবৃন্দ
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টারাও ঐতিহাসিক এই দিনে ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতার প্রতি জোর দিয়েছেন। তাঁদের মতে:
> “শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে যে নতুন পথচলা শুরু হয়েছিল, তার মূল ভিত্তি ছিল সুবিচার, স্বচ্ছতা ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠন। ফ্যাসিবাদের শিকড় সমাজ ও রাষ্ট্রের নানাবিধ প্রতিষ্ঠানে গভীরে রয়ে গেছে। কেবল ক্ষমতার পরিবর্তনেই ফ্যাসিবাদ শেষ হয় না; বরং গণতান্ত্রিক চর্চা, বিচারিক স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার সুরক্ষার মাধ্যমে ফ্যাসিবাদের পুনর্জাগরণকে চিরতরে রুখে দিতে হবে।”
>
৩৬ জুলাইয়ের শিক্ষা ও আগামীর পথরেখা
গণঅভ্যুত্থান-উত্তর বাংলাদেশে আজকের এই দিনটি রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজকে এক যৌথ দায়বদ্ধতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। রাজপথে রক্ত দেওয়া হাজারো তরুণ ও সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগ স্মরণ করিয়ে দেয় যে, জনগণের ক্ষমতার চেয়ে বড় কোনো শক্তি নেই।
* রাষ্ট্র সংস্কার ও বিচার নিশ্চিতকরণ: ফ্যাসিবাদের মেয়াদে ঘটে যাওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধ, দুর্নীতি ও অর্থপাচারের বিচার ত্বরান্বিত করা।
* গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের পুনঃগঠন: নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দলীয় প্রভাবমুক্ত ও জনকল্যাণমুখী করা।
* জাতীয় ঐক্য বজায় রাখা: ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা জাতীয় ঐক্য রক্ষা করে যেকোনো অভ্যন্তরীণ বা বৈদেশিক ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করা।
উপসংহার
‘৩৬ জুলাই’ কেবল একটি ঐতিহাসিক অর্জন বা স্মৃতিতর্পণ নয়; এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, বাকস্বাধীনতা ও মানবাধিকার রক্ষার এক জীবন্ত ইশতেহার। রাষ্ট্রকাঠামো থেকে ফ্যাসিবাদের অবশিষ্ট চিহ্ন মুছে ফেলে একটি বৈষম্যহীন, সাম্য ও মানবিক মর্যাদাভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হোক ৩৬ জুলাইয়ের প্রকৃত অঙ্গীকার।
মন্তব্য করুন