মোঃ নাসির উদ্দিন
গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি
এতদিন কাঁঠালের বীজ রান্নাঘর, বাজার কিংবা প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে অবহেলিত বর্জ্য হিসেবেই বিবেচিত হতো। অথচ সেই বীজ থেকেই এবার ঘনীভূত খনিজসমৃদ্ধ (মিনারেল কনসেন্ট্রেট) খাদ্য উপাদান তৈরির অভিনব প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (গাকৃবি) গবেষকরা। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সরকারের পেটেন্ট অর্জন করেছে এ প্রযুক্তি, যা দেশের পুষ্টি নিরাপত্তা, খাদ্যশিল্প ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
গাকৃবির খাদ্য প্রকৌশল বিভাগের প্রখ্যাত খাদ্য বিজ্ঞানী প্রফেসর ড. মো. এমদাদুল হক এবং তাঁর স্নাতকোত্তর গবেষক মো. আকরাম হোসেন যৌথভাবে তিন বছরের গবেষণার মাধ্যমে ২০২৫ সালের নভেম্বরে এ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. জিকেএম মোস্তাফিজুর রহমানের সক্রিয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত এ গবেষণার অর্থায়ন করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গ্র্যান্টস ফর অ্যাডভান্সড রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন (GARE) প্রকল্প।
উদ্ভাবনের স্বীকৃতিস্বরূপ শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি) প্রযুক্তিটিকে পি/বিডি/২০২৪/০০০০৪০ নম্বর পেটেন্ট প্রদান করেছে। গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় নামে প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তনের পর এটিই প্রথম পেটেন্টপ্রাপ্ত উদ্ভাবন। এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট উদ্ভাবিত প্রযুক্তির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২১টিতে।
গবেষণায় দেখা গেছে, শুকনো কাঁঠালের বীজে যেখানে প্রায় ২ শতাংশ খনিজ উপাদান থাকে, সেখানে নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে তা ঘনীভূত করে ৩৩ শতাংশেরও বেশি খনিজসমৃদ্ধ মিনারেল কনসেন্ট্রেট উৎপাদন সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ খনিজের ঘনত্ব প্রায় ১৬ থেকে ১৭ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা যায়।
গবেষকদের মতে, এই মিনারেল কনসেন্ট্রেটে পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস, আয়রন, জিঙ্ক ও ম্যাঙ্গানিজের মতো মানবদেহের জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদান বিদ্যমান। এগুলো হাড় ও দাঁতের গঠন, রক্ত উৎপাদন, স্নায়ুতন্ত্র ও পেশির কার্যক্রম, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং বিভিন্ন এনজাইমের কার্যকারিতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তারা জানান, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদিত মিনারেল কনসেন্ট্রেট বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে ব্যবহার করে অধিক পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্য উৎপাদন সম্ভব হবে। একই সঙ্গে এতদিন অবহেলিত কাঁঠালের বীজ উচ্চমূল্য সংযোজিত খাদ্য উপাদানে পরিণত হবে, যা খাদ্য অপচয় কমানোর পাশাপাশি কৃষিজ বর্জ্যের কার্যকর ব্যবহার, পরিবেশ সংরক্ষণ, পুষ্টি নিরাপত্তা এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. জিকেএম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “এটি শুধু একটি পেটেন্ট অর্জনের বিষয় নয়, বরং বাংলাদেশের কৃষি, খাদ্য ও পুষ্টি গবেষণায় একটি নতুন মাইলফলক। আমাদের গবেষকরা দেখিয়ে দিয়েছেন, কৃষিজ বর্জ্য হিসেবেই পরিচিত একটি উপাদানকে কীভাবে উচ্চমূল্যের পুষ্টিসমৃদ্ধ সম্পদে রূপান্তর করা যায়। গবেষণাগারের উদ্ভাবনকে শিল্প ও সমাজের উপযোগী প্রযুক্তিতে রূপান্তরের মাধ্যমে দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।”
প্রযুক্তিটির অন্যতম উদ্ভাবক প্রফেসর ড. মো. এমদাদুল হক বলেন, “কাঁঠালের বীজ থেকে ঘনীভূত খনিজসমৃদ্ধ খাদ্য উপাদান তৈরির এই প্রযুক্তি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা গেলে দেশে নতুন পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্যপণ্য উন্নয়নের পাশাপাশি কাঁঠালভিত্তিক শিল্পের বিকাশ, কৃষকের আয় বৃদ্ধি এবং কৃষিজ সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।”
উল্লেখ্য, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ পর্যন্ত ৯৭টি উন্নত ফসলের জাত এবং ২১টি প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হয়েছে, যা দেশের কৃষি গবেষণা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।
মন্তব্য করুন