(নীলফামারী) প্রতিনিধি:
নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় জ্বালানি তেল নিতে এখন আর দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে না। কয়েকদিন আগেও যেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতো, এখন সেখানে মাত্র কয়েক মিনিটেই মিলছে তেল। এতে স্বস্তি ফিরেছে সাধারণ চালক, পরিবহন শ্রমিক ও কর্মজীবী মানুষের মধ্যে। উপজেলা সদরে সামান্য ভিড় থাকলেও অধিকাংশ ফিলিং স্টেশনেই চাপ কমে গেছে।
উপজেলার একটি এনজিওতে কর্মরত আতাউর রহমান জানান, আগে তেল নিতে পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো। এতে নিয়মিত অফিসে দেরি হতো এবং নানা সমস্যায় পড়তে হতো। তবে সোমবার (৪ মে) সকালে উপজেলার খালিশা চাপানি ইউনিয়নের মেসার্স তিস্তা ফিলিং স্টেশনে গিয়ে মাত্র পাঁচ মিনিটেই তেল নিতে সক্ষম হন তিনি।
উপজেলার বিভিন্ন এনজিও কর্মী, বাইকচালক, পরিবহন শ্রমিক ও ব্যক্তিগত গাড়ির মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত দুই সপ্তাহ আগেও তেলের জন্য দীর্ঘ লাইন ছিল। অনেক ক্ষেত্রে একাধিক পাম্প ঘুরেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছিল না। এতে পরিবহন খাতে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছিল এবং দৈনন্দিন কর্মজীবন ব্যাহত হচ্ছিল।
সোমবার সকালে উপজেলা সদরের মেসার্স আফতাব ফিলিং স্টেশন, মেসার্স আলম ফিলিং স্টেশন এবং মেসার্স তিস্তা ফিলিং স্টেশনসহ বিভিন্ন পাম্প ঘুরে দেখা যায়, কোথাও দীর্ঘ লাইন নেই। মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার, অটোরিকশা ও মাইক্রোবাসসহ সব ধরনের যানবাহন ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যেই প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাচ্ছে।
খালিশা চাপানি ইউনিয়নের ডালিয়া এলাকার বাসিন্দা আয়নাল হক বলেন, “গত কয়েকদিন আগেও তেলের জন্য কয়েকটি পাম্প ঘুরতে হয়েছে। আজ এসে দেখি কোনো ভিড় নেই। যতটুকু দরকার ততটুকুই পেয়েছি, কোনো সীমাবদ্ধতাও নেই।”
ঝুনাগাছ চাপানি ইউনিয়নের মেসার্স গ্রীন ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, মাত্র পাঁচটি মোটরসাইকেল লাইনে রয়েছে। এছাড়া তিন থেকে পাঁচটি প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাসও স্বল্প সময়েই তেল নিচ্ছে।
স্টেশনটির কর্মচারী আবু হোসেন বলেন, “আজ প্রায় ফাঁকা অবস্থা। কোনো ভিড় নেই। যে আসছে, এক থেকে দুই মিনিটেই তেল পেয়ে যাচ্ছে। এতে আমাদেরও সুবিধা হচ্ছে, চালকরাও স্বস্তিতে আছেন।”
ব্যক্তিগত গাড়ির মালিক সোহাগ খান বলেন, “গত কয়েকদিন আগেও লাইনে দাঁড়ালে রাস্তা পর্যন্ত ব্লক হয়ে যেত। ট্রাফিক পুলিশের ঝামেলাও ছিল। এখন পাম্পের ভেতরেই গাড়ি রাখার জায়গা খালি পড়ে আছে।”
উপজেলা সদরের আফতাব ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, ১৫ থেকে ২০টি মোটরসাইকেলের ছোট লাইন রয়েছে। সেখানে তেল নিতে আসা আলী হোসেন বলেন, “গত এক মাসে তেল নিতে যুদ্ধ করতে হয়েছে। আজ একেবারে উল্টো চিত্র। কোনো ভিড় নেই।”
আরেক বাইকচালক ইমরান বলেন, “আগে মনে হতো কোনো সিন্ডিকেটের কারণে এত ভিড় হচ্ছে। এখন দুই দিন ধরে দেখছি কোথাও লাইন নেই। তাহলে আগের ভিড় কোথায় গেল?”
মেসার্স আফতাব ফিলিং স্টেশনের ট্যাগ অফিসার আমির বোরহান বলেন, “এখন পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ থাকায় পাম্পে কোনো চাপ নেই। ক্রেতারা খুব অল্প সময়েই তেল নিতে পারছেন। আমরা সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ‘ফুয়েল কার্ড’-এর মাধ্যমে তেল বিতরণ করছি। সার্বিক পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক রয়েছে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরানুজ্জামান বলেন, “ডিমলা উপজেলায় জ্বালানি তেল সরবরাহ বর্তমানে স্বাভাবিক রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে যে ভিড় ও চাপ ছিল, তা অনেকটাই কমে এসেছে। আমরা নিয়মিত মনিটরিং জোরদার করেছি, যাতে কোথাও কৃত্রিম সংকট বা অনিয়মের সুযোগ না থাকে। কেউ তেল মজুদ বা অতিরিক্ত দামে বিক্রির চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
জ্বালানি সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হওয়া, তদারকি বৃদ্ধি এবং অপ্রয়োজনীয় মজুদ কমে যাওয়ার ফলে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে। পাশাপাশি চাহিদা কিছুটা কমে যাওয়ায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে চাপও কমেছে।
তবে হঠাৎ করে ভিড় কমে যাওয়ায় অনেকের মনে প্রশ্ন উঠেছে, আগে কি জ্বালানির ঘাটতি ছিল? সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি সরাসরি ঘাটতির বিষয় নয়। জ্বালানির দাম বৃদ্ধির পর চাহিদা বেড়ে যাওয়া, কিছু ক্ষেত্রে সরবরাহে চাপ এবং ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার কারণে সাময়িকভাবে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়েছিল।
বর্তমানে সরবরাহ স্বাভাবিক, মনিটরিং জোরদার এবং বাজারে শৃঙ্খলা ফিরে আসায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে আর আগের মতো ভিড় নেই।
উল্লেখ্য, গত ১৮ এপ্রিল সরকার জ্বালানি তেলের নতুন মূল্য নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। নতুন দরে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩০ টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা এবং পেট্রলের দাম ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
মন্তব্য করুন