লিড নিউজ ২৪ প্রতিবেদক, কুমিল্লা:
মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বেরিয়েছিল ১৩ বছরের কিশোর ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতিম। কিন্তু সেই শখের আইফোনই যে তার কাল হবে, তা ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেনি পরিবার। আইফোনটি ছিনিয়ে নিতেই পরিকল্পিতভাবে তাকে ডেকে নেওয়া হয় লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গলে। ছিনতাইয়ে বাধা দিলে বাঁশের লাঠি দিয়ে মাথায় নির্মমভাবে আঘাত করে হত্যা করা হয় এই স্কুলছাত্রকে। রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের সন্তান অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের এই চাঞ্চল্যকর রহস্য উন্মোচনের কথা জানান কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার জানান, গত শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) নিখোঁজ হওয়ার পর সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ। সেখানে দেখা যায়, বিকেল সোয়া ৩টার দিকে সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন (১৯) নামের এক তরুণের সঙ্গে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার জঙ্গলের দিকে যাচ্ছে অপ্রতিম। আসামিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাতে পুলিশের এই কর্মকর্তা জানান, বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে পাহাড়ঘেরা ওই নির্জন বনে অপ্রতিমের কাছ থেকে ফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে ঘাতকেরা। এ সময় অপ্রতিম সাহসিকতার সঙ্গে বাধা দিলে শুরু হয় ধস্তাধস্তি। একপর্যায়ে প্রথমে সাইফুল এবং পরে তার সঙ্গে থাকা আরও দুই কিশোর বাঁশের লাঠি দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় সজোরে আঘাত করে। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর আইফোনটি নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যায় তারা।
এই নির্মম হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯) এবং ১৫ ও ১৬ বছর বয়সী আরও দুই কিশোরকে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে আগে থেকে পুলিশের খাতায় কোনো অপরাধের রেকর্ড নেই। পরে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযানে সাইফুলের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তার বাড়ি থেকেই উদ্ধার করা হয় অপ্রতিমের ব্যবহৃত সেই আইফোনটি। এছাড়া এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে আরও এক তরুণকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সংবাদ সম্মেলনে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা আছে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, “কুমিল্লায় ইতোমধ্যে আড়াই শতাধিক কিশোর গ্যাং সদস্যকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। এই খুনের সঙ্গে তাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।” এ সময় তিনি অভিভাবকদের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানিয়ে বলেন, সন্তান কখন কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে— সে বিষয়ে বাবা-মাকে অবশ্যই কড়া নজর রাখতে হবে। বিশেষ করে অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের হাতে দামি স্মার্টফোন তুলে দেওয়ার আগে অভিভাবকদের আরও বেশি সচেতন হওয়া জরুরি।
নিহত অপ্রতিম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান এবং কুমিল্লার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। শুক্রবার দুপুরে কুমিল্লার কোটবাড়ির গন্ধমতি এলাকার বাসা থেকে সে নিখোঁজ হয়। এরপর শনিবার দুপুরে সানন্দা এলাকার লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গল থেকে তার আঘাতপ্রাপ্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। অপ্রতিমের এমন অকাল ও নির্মম মৃত্যুতে গোটা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার এবং স্থানীয়দের মাঝে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। একই সঙ্গে এলাকায় কিশোর অপরাধীদের দৌরাত্ম্য নিয়ে জনমনে সৃষ্টি হয়েছে চরম ক্ষোভ ও আতঙ্ক।
মন্তব্য করুন