লিড নিউজ ২৪ স্পেশাল রিপোর্টঃ
সায়মন খান, লিড নিউজ ২৪ঃ
ফ্যাসিস্ট শক্তির আস্ফালন চিরস্থায়ী হয় না, ইতিহাসের এই অমোঘ সত্যটি আজ বাংলার মাটিতে আবারও প্রমাণিত হলো। ছাত্র-জনতার রক্তে রঞ্জিত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে নেতৃত্ব দেওয়ার দায়ে এবার চূড়ান্ত পরিণতি পেলেন পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার অন্যতম প্রধান দোসর ওবায়দুল কাদের। ক্ষমতাচ্যুত ও নিষিদ্ধ ঘোষিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের এই সাধারণ সম্পাদকসহ সাত ঘাতককে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর এই রায়ের মাধ্যমে শুধু আইনি বিচারই নিশ্চিত করেননি, বরং বাংলার মাটিতে ফ্যাসিবাদের শিকড় উপড়ে ফেলার এক অসামান্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে যাওয়া অপর আসামিরা হলেন—আরেক কুখ্যাত স্বৈরাচার দোসর আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধকারী ও প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর কারিগর সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, সন্ত্রাসী সংগঠন যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান, এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালানো নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। উল্লেখ্য, বিচারের মুখোমুখি হতে ভয় পাওয়া এই সাত কাপুরুষ ঘাতকের সবাই বর্তমানে পলাতক। গত বছরের ১৭ নভেম্বর স্বৈরাচারী শেখ হাসিনাকে জুলাই গণহত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। প্রায় দশ মাসের মাথায় এবার তার প্রধান সহযোগী হিসেবে পরিচিত ওবায়দুল কাদেরসহ অন্যদের ফাঁসির রায় হলো। ৫ আগস্টের গৌরবময় অভ্যুত্থানের পর থেকে পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালে এটি মানবতাবিরোধী অপরাধের সপ্তম রায়। এ পর্যন্ত শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান ও ওবায়দুল কাদেরসহ ২২ জন কুখ্যাত খুনির ফাঁসির আদেশ হয়েছে। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ২২ আসামির মধ্যে ১৮ জনই বর্তমানে পলাতক এবং কারাগারে আছেন মাত্র চারজন।
ট্রাইব্যুনালে উত্থাপিত আনুষ্ঠানিক অভিযোগে ওবায়দুল কাদেরের ফ্যাসিবাদী রূপের বীভৎস চিত্র উঠে এসেছে। জুলাইয়ের রক্তগঙ্গার প্রধান রূপকার ছিলেন তিনি নিজেই। ২০২৪ সালের ১১ জুলাই ছাত্রলীগের সাদ্দামকে ফোনে তিনি নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন, ‘মারো না কেন ওদের, প্রশ্রয় দাও কেন?’ এরপর ১৪ জুলাই শেখ হাসিনা উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার পর, ১৫ জুলাই ধানমন্ডির কার্যালয়ে বসে ‘আত্মস্বীকৃত রাজাকারদের জবাব দেবে ছাত্রলীগ’ বলে তিনি তার পেটোয়া বাহিনীকে সাধারণ ছাত্র-জনতার ওপর লেলিয়ে দেন। তার এই প্রকাশ্য নির্দেশেই সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশজুড়ে পৈশাচিক হামলা চালায়, যার ফলে নারীসহ তিন শতাধিক শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হন।
বর্বরতার এখানেই শেষ ছিল না। রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে হত্যাযজ্ঞ চালানোর ব্লু-প্রিন্টও তৈরি করেছিলেন তিনি। ১৬ জুলাই ইন্টারনেট ধীর করার জন্য তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলককে নির্দেশ দেন তিনি। একই দিনে চট্টগ্রামে আ জ ম নাছিরকে এলাকা দখলে রাখার নির্দেশ দিয়ে ওয়াসিম, শান্ত, ফারুকসহ রংপুরে শহীদ আবু সাঈদ হত্যার পথ প্রশস্ত করেন এই খুনি। এরপর ১৭ ও ১৮ জুলাই দলীয় নেতা-কর্মীদের রাজপথে নেমে প্রতিরোধ গড়ার নির্দেশ দিয়ে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করেন। ১৯ জুলাই গণভবনে বৈঠক শেষে তিনি প্রকাশ্য দম্ভে ‘শুট অ্যাট সাইট’ বা দেখামাত্রই গুলির মতো ভয়াবহ নির্দেশ দেন। শুধু তাই নয়, আন্দোলন দমাতে আসাদুজ্জামান খান, আনিসুল হক, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশদের নিয়ে সরকারি স্থাপনায় আগুন দিয়ে উল্টো ছাত্র-জনতার ওপর দায় চাপানোর ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রও তিনি শেখ হাসিনার সাথে মিলে করেছিলেন।
লিড নিউজ ২৪-এর বিশ্লেষণে এ কথা সুস্পষ্ট যে, এ রায় শুধু কয়েকজন খুনির ফাঁসির আদেশ নয়; এটি বাংলাদেশের বুকে গেঁথে বসা দীর্ঘ পনেরো বছরের ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত একটি বিজয়। যারা একদিন ক্ষমতার দম্ভে বলেছিল ‘খেলা হবে’, আজ ছাত্র-জনতার রক্তের দামে কেনা স্বাধীন দেশে আইনের কাঠগড়ায় তাদেরই চূড়ান্ত পরাজয় হলো। রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে নিরীহ ছাত্র-জনতার ওপর এমন নির্মম হত্যাযজ্ঞ ইতিহাসে বিরল। এখন ছাত্র-জনতার একটাই দাবি—পলাতক এই খুনিদের বিশ্বের যে প্রান্তেই লুকিয়ে থাকুক না কেন, দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের রায় কার্যকর করতে হবে। তবেই জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মা প্রকৃত শান্তি পাবে এবং ভবিষ্যতে বাংলার মাটিতে আর কোনো স্বৈরাচার মাথা চাড়া দিয়ে ওঠার সাহস পাবে না।
মন্তব্য করুন