আগামী ২৫ বৈশাখ (৮ মে) শুক্রবার বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী। এ উপলক্ষে নতুন সাজে সাজানো হচ্ছে বিশ্বকবির স্মৃতিধন্য খুলনার ফুলতলা উপজেলার দক্ষিণডিহি রবীন্দ্র কমপ্লেক্স এবং রূপসা উপজেলার পিঠাভোগ গ্রামে রবীন্দ্র স্মৃতি সংগ্রহশালা।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে তিনদিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়েছে। আয়োজনের প্রতিপাদ্য ‘শান্তি ও মানবতার কবি রবীন্দ্রনাথ’। রবী ঠাকুরের জন্মজয়ন্তীকে স্মরণীয় করতে আয়োজন করা হচ্ছে তিনদিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালা। থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও লোকজ মেলা। যা শুরু হবে আগামী ৮ মে শুক্রবার। ফলে পিঠাভোগ ও দক্ষিণডিহিতে উচ্ছ্বাস তৈরি হয়েছে। প্রতি বছরের মত অপেক্ষায় থাকা রবীন্দ্রভক্তদের পাশাপাশি উল্লেখিত দু’টি গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যেও ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা বিরাজ করছে।
গত মঙ্গলবার সরেজমিনে পিঠাভোগে গিয়ে রবী ঠাকুরের জন্মজয়ন্তীর নানা আয়োজন চোখে পড়ে। এখানে উন্মুক্ত মঞ্চ রয়েছে। রয়েছে রবী ঠাকুরের আবক্ষ মূর্তি। একতলাবিশিষ্ট সংগ্রহশালা ভবনে পাঠকক্ষও আছে। রবী ঠাকুরের ছবি, বংশ তালিকা রয়েছে। বাইরে রবী ঠাকুরের বংশ তালিকা আছে। সেখানে দেখা যায়, কুশরী থেকে কলকাতার পরিবার ঠাকুর পদবি পেয়েছেন। এখানে কবির বর্তমান বংশধররা ‘কুশরী’ উপাধি নিয়ে আছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছর রবীন্দ্রজয়ন্তীতে শান্তি নিকেতনের আদলে এখানেও আলপনা আঁকা হয়। রবীন্দ্র বিষয়ে আলোচনা, রবীন্দ্রনাথের সমাজ চিন্তা, কৃষি ভাবনা, গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন সম্পর্কিত বিষয়ভিত্তিক আলোচনাও অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া রবীন্দ্র প্রবন্ধ, রবীন্দ্র কবিতা, নৃত্য এবং নাটকের আয়োজন করা হয়। গ্রামীণ মেলা হয়। দূর দুরান্ত থেকে আসা বহু লোকের সমাগম হয় এখানে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্ব পুরুষের আবাসভূমি রূপসার পিঠাভোগ এবং ফুলতলার দক্ষিণডিহিতে কবির শ্বশুরালয় হওয়ায় এ অঞ্চলের মানুষ গর্ববোধ করেন।
খুলনা জেলা প্রশাসনের সূত্রে জানা গেছে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বংশধরের মধ্যে দ্বীননাথ কুশারীর অষ্টম পুরুষ তারানাথ কুশারী তৎকালীন খুলনার ভৈরব-তীরবর্তী রূপসা উপজেলার ঘাটভোগ ইউনিয়নের পিঠাভোগ গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। তারানাথ কুশারীর দুই পুত্র রামগোপাল ও রামনাথ। রামগোপালের পুত্র জগন্নাথ কুশারীই ছিলেন ঠাকুর বংশের আদি পুরুষ। যিনি খুলনা জেলার ফুলতলার দক্ষিণডিহি নিবাসী শুকদেব রায় চৌধুরীর এক কন্যাকে বিয়ে করে পীরালি ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ভুক্ত হন। জগন্নাথ কুশারীর পরবর্তী বংশধর পঞ্চানন কুশারী। পারিবারিক মত-পার্থক্যের কারণে পঞ্চানন কুশারী খ্রিষ্টীয় সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগে কলকাতা গ্রামের (কলকাতা ছিল একটি গ্রামের নাম) দক্ষিণে আদি গঙ্গার তীরে গোবিন্দপুরে বসতি স্থাপন করেন। যেহেতু তাঁরা ব্রাহ্মণ ছিলেন তাই জেলে, মালো, কৈবর্ত প্রভৃতি নিম্নবর্ণের প্রতিবেশীরা তাঁদের ‘ঠাকুরমশাই’ বলে সম্বোধন করতেন। এভাবেই মহেশ্বরের পুত্র পঞ্চানন ‘কুশারী’ একসময় হয়ে যান জয়রাম ঠাকুর। পঞ্চানন থেকেই কলকাতার পাথুরিয়াঘাটা, জোড়াসাঁকো ও কয়লাঘাটার ঠাকুর গোষ্ঠীর উৎপত্তি। পঞ্চানন ঠাকুরের অধস্তন সপ্তম পুরুষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
অপরদিকে মহেশ্বর কুশারীর অপর সন্তান প্রিয়নাথ কুশারী পিঠাভোগ গ্রামে থেকে যান। যার সপ্তদশ ও অষ্টাদশ বংশধর এখনো পিঠাভোগ গ্রামে বসবাস করছেন।
সূত্র জানায়, রূপসার পিঠাভোগ গ্রামে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্ব পুরুষের আবাসভূমিটি দীর্ঘ বছর পরিত্যক্ত ও অবৈধ দখলে চলে যায়। পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালে সরকার আদি বাড়িটি উদ্ধার করে। ২০১১-১২ অর্থবছরে সাতটি বর্গে পরীক্ষামূলক প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজ পরিচালনা করা হয়। বর্তমানে এটি রবীন্দ্র স্মৃতি সংগ্রহশালা নামে জাতীয় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে।
রবীন্দ্রনাথের পূর্ব পুরুষের বংশ লতিকার ২৪ নং বংশধর ও রূপসা উপজেলা প্রশাসন কর্তৃক রবীন্দ্রনাথের বাড়ি দেখ-ভালের দায়িত্বরত বরুন কুশারী বাসস’কে বলেন, বাংলাদেশের সেরা মেলা হয় রূপসার ঘাটভোগ ইউনিয়নের পিঠাভোগ রবী ঠাকুরের বসতভিটায়। প্রচুর লোক সমাগম হয়। কুঠিবাড়িতেও এমন লোকের সমাগম হয় না। এখানে রবী ঠাকুরের বই বিক্রি থেকে শুরু করে মনোহরী দোকানপাটসহ নানা পদের খাবারও বিক্রি হয়।
রূপসার ঘাটভোগ এলাকার পিঠাভোগের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫তম পুরুষের পুত্রবধূ ছায়ারাণী বাসস’কে বলেন, রবী ঠাকুরের এ ভিটায় প্রতিবছর অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে স্কুল, কলেজের ছেলে-মেয়েসহ বিভিন্ন জায়গার লোকজন আসে। বহু লোকের সমাগম হয়।দোকান বসে।
দোকানীরা পাপড়, চা-পান আবার কেউ সাজ-সজ্জার পসরা সাজায়। এছাড়া এলাকার বধুরা লাল পাইড়ের হলুদ শাড়ি পড়ে সাজ-সজ্জা করে। রবী ঠাকুরের বসতভিটা রূপসায় হওয়ায় আমরা গর্বিত, বলেন তিনি।
রূপসা এলাকার বাসিন্দা আব্দুল হালিম বাসস’কে বলেন, এ ধরনের অনুষ্ঠান মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ায় এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ ও আলোচনার মাধ্যমে সমাজকে সমৃদ্ধ করে।
তিনি আরও বলেন, নোবেল বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে আন্তর্জাতিক মর্যাদায় উন্নীত করেছেন এবং তাঁর পূর্ব পুরুষের ভিটা ঘাটভোগ ইউনিয়নের পিঠাভোগে অবস্থিত হওয়ায় রূপসাবাসীর জন্য গর্বের।
রূপসার নৈহাটী নেহালপুর এলাকার বাসিন্দা সুখেন রায় বলেন, প্রতিবারের ন্যায় এবারও বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মজয়ন্তীর তিনদিনব্যাপী জাতীয় অনুষ্ঠান শুরু হবে আগামী ৮ মে শুক্রবার। ২০১৫ সাল থেকে এ জাতীয় অনুষ্ঠান হয়।
অপরদিকে, খুলনা শহর থেকে প্রায় ২৮ কিলোমিটার পশ্চিমে ফুলতলা উপজেলার অন্তর্গত দক্ষিণডিহি গ্রামে বেণীমাধব রায় চৌধুরীর আদি বাড়ি। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই রায় পরিবারের জামাতা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্বশুর ছিলেন জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের জমিদারি এস্টেটের বেতনভুক্ত কর্মচারী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মামার বাড়িও একই গ্রামে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতা মহর্ষী দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর বিয়ে করেন দক্ষিণডিহির অধিবাসী রামনারায়ণ রায় চৌধুরীর কন্যা সারদা দেবীকে, যেটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্বশুরবাড়ি থেকে মাত্র আধা কিলোমিটার দূরে। মামার বাড়ি ও তাঁর শ্বশুর ঠাকুর বাড়ির কর্মচারীর সুবাদে মৃণালিনী দেবীর সঙ্গে পরিচয় ঘটে।
উল্লেখ্য, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আগের পাঁচ পুরুষও এই গ্রামে বিয়ে করেন। কারণ, এ এলাকাতেই তখন ঠাকুর পরিবারের সমগোত্র পীরালি ব্রাহ্মণদের বসবাস ছিল। ১৮৮৩ সালে বেণীমাধব রায় চৌধুরী ও দাক্ষায়নী দেবীর একমাত্র কন্যা ভবতারিণী দেবী ওরফে ফুলি ওরফে ফেলির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিয়ে হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মামা নিরাঞ্জন রায় চৌধুরী ও হিরণ¥য় রায়
চৌধুরীর মাধ্যমে কন্যাহ্বানে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে তাঁদের বিয়ে হয়। ঠাকুর বাড়ির প্রথানুযায়ী বিয়ের পর ভবতারিণী দেবীর নাম রাখা হয় মৃণালিনী দেবী।বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী দক্ষিণডিহি এবং পিঠাভোগে আলাদা আলাদা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। ইতোমধ্যেই সকল প্রস্তুতিও সম্পন্ন করা হয়েছে।
মন্তব্য করুন