নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। চাঁদা দাবি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, মালামাল ও যানবাহন নিয়ে যাওয়া, প্রাণনাশের হুমকি এবং মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখানোর মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে জাহিদ রহমান জন নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী কয়েকজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দা এসব অভিযোগ করেছেন। তাঁদের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে কয়েকজন সহযোগীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি এলাকায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কেউ পুরি-সিঙ্গারা, কেউ শীতের পিঠা, আবার কেউ ডাব বিক্রি করে সংসার চালান। সামান্য আয়ের ওপর নির্ভরশীল এসব ব্যবসায়ীর অভিযোগ, বিভিন্ন অজুহাতে অর্থ দাবি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের কারণে তাঁরা স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারছেন না।
পুরি-সিঙ্গারা বিক্রেতার দোকানে হামলা ও গাড়ি নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ
একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী অভিযোগ করে বলেন, পুরি-সিঙ্গারা বিক্রি করেই তাঁর পরিবারের জীবিকা নির্বাহ হয়। তাঁর দাবি, বিএনপির নাম ব্যবহার করে জাহিদ রহমান জন আরও চার-পাঁচজনকে সঙ্গে নিয়ে তাঁর দোকানে হামলা করেন। একপর্যায়ে তাঁর ব্যবসায়িক গাড়ি নিয়ে যাওয়া হয় এবং টাকা না দিলে সেটি ফেরত দেওয়া হবে না বলে জানানো হয়।
ওই ব্যবসায়ীর দাবি, এ ঘটনায় তিনি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারছেন না। প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলা আশপাশের কয়েকজন দোকানদারের মধ্যেও কেউ কেউ ঘটনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ সত্যতা নিশ্চিত করতে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, প্রাসঙ্গিক নথি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
ভয়ে প্রতিবাদ করতে পারছেন না ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা
এলাকার একজন বৃদ্ধ নারী শীতের পিঠা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তাঁর অভিযোগ, জাহিদ ও তাঁর সহযোগীদের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সময় ঝামেলা ও হামলার ঘটনা ঘটে। এ কারণে তাঁরা আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
অন্যদিকে, একজন ডাব বিক্রেতার অভিযোগ, ১৫০ টাকা দামের দুটি ডাব খাওয়ার পর তাঁকে মাত্র ১০০ টাকা দেওয়া হয়। ভয়ে তিনি প্রতিবাদ করতে পারেননি বলে জানান ওই ব্যবসায়ী।
ভুক্তভোগীদের আরও অভিযোগ, চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। রাতের আঁধারে দোকান থেকে তুলে নিয়ে নির্যাতনের ভয় দেখানোর অভিযোগও করেছেন কেউ কেউ। তবে এসব অভিযোগের স্থান, সময় ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ব্যবসায়ীর স্ত্রীকে মারধরের অভিযোগ
এক ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীর স্ত্রী অভিযোগ করেন, তাঁর স্বামীর ওপর হামলার ঘটনা থামাতে গেলে তাঁকেও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। স্বামীকে রক্ষা করতে এগিয়ে গিয়ে নিজেও হামলার শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।
এ ধরনের অভিযোগের প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনে ভুক্তভোগীদের বক্তব্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ, চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি থাকলে তা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন নিয়ে এলাকায় প্রশ্ন
জাহিদ রহমান জনের রাজনৈতিক পরিচয় ও সাংগঠনিক ভূমিকা নিয়েও এলাকায় প্রশ্ন উঠেছে বলে দাবি করেছেন কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা।
স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, ৫ আগস্টের আগে তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তাঁকে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হিসেবে পরিচয় দিতে দেখা গেছে বলেও তাঁদের দাবি। এ বিষয়ে ৩০ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায় অনুসন্ধানকালে কয়েকজন সাধারণ মানুষ তাঁর অতীত রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
তবে তাঁর পূর্ববর্তী ও বর্তমান রাজনৈতিক পরিচয়, দলীয় পদ এবং সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পৃক্ততার বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংগঠনের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও প্রামাণ্য নথি পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের পর কেউ যদি নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করেন, তবে তাঁর কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত হবে? তাঁদের বক্তব্য, রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই হোক, কারও বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, হুমকি কিংবা হয়রানির অভিযোগ থাকলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা উচিত।
এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও কয়েকজন বাসিন্দার দাবি, তাঁরা নিরাপদে ব্যবসা পরিচালনা করতে চান। রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে কেউ তাঁদের হয়রানি করলে তার প্রতিকার চান তাঁরা।
পারিবারিক বিরোধের মীমাংসার নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগ
এদিকে, জাহিদ রহমান জনের বিরুদ্ধে পারিবারিক বিরোধের মীমাংসার নামে অর্থ আদায়, হুমকি এবং অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের চাপ দেওয়ার অভিযোগসংবলিত একটি লিখিত অভিযোগের অনুলিপি গণমাধ্যমের হাতে এসেছে বলে জানা গেছে।
ওই অভিযোগে ডালিয়া নামের এক নারী দাবি করেন, স্বামী বজলুর রহমান বিপুলের সঙ্গে তাঁর দাম্পত্য বিরোধ দেখা দিলে স্থানীয়ভাবে মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেই সূত্রে জাহিদ রহমান জনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর আদাবর এলাকার হক সাহেবের গ্যারেজ নামের স্থানের একটি কাজি অফিসে তাঁদের পুনরায় বিয়ের ব্যবস্থা করা হয়।
ওই নারীর দাবি, তাঁর স্বামীকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে দুই লাখ টাকা নেওয়া হয়। এর মধ্যে ৮০ হাজার টাকা তাঁকে দেওয়া হয় এবং বাকি এক লাখ ২০ হাজার টাকা জোরপূর্বক নেওয়া হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। পরবর্তী সময়ে আরও ৫০ হাজার টাকা, রেস্তোরাঁয় খাওয়া এবং মোটরসাইকেল আটকের প্রসঙ্গসহ বিভিন্ন অজুহাতে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও ওই লিখিত নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া, ওই নারী অভিযোগ করেন, তাঁকে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য চাপ দেওয়া হয়। দাবি পূরণ না হলে তাঁর সংসার, স্বামীর ব্যবসা ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে হুমকি দেওয়া হয় বলেও তিনি দাবি করেন। বর্তমানে স্বামী-সন্তানসহ এলাকা ছেড়ে নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে জীবনযাপন করছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করেছেন তিনি।
তবে লিখিত অভিযোগে উত্থাপিত এসব বক্তব্যের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। সংশ্লিষ্ট নথির সত্যতা, অর্থ লেনদেনের তথ্য এবং অভিযোগের অন্যান্য দিক যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগপত্রে জাহিদ রহমান জনকে আদাবর থানা এলাকায় স্বেচ্ছাসেবক দলের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের আহ্বায়ক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তাঁর প্রকৃত সাংগঠনিক পদ এবং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দলের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যও যাচাই করা প্রয়োজন।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও এলাকাবাসীর প্রশ্ন—নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কে?
স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের অভিযোগ, এসব ঘটনার কারণে এলাকায় তাঁদের মধ্যে ভয় ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাঁদের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবের কারণে কেউ যেন আইনের ঊর্ধ্বে থাকার সুযোগ না পান।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, তাঁদের অধিকাংশেরই বড় পুঁজি নেই। দিন শেষে যে আয় হয়, তা দিয়ে পরিবারের খাবার, বাড়িভাড়া ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে হয়। এ অবস্থায় ব্যবসায়িক মালামাল নিয়ে যাওয়া, অর্থ দাবি কিংবা ভয়ভীতি প্রদর্শনের শিকার হলে তাঁদের জীবিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং প্রমাণের ভিত্তিতে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
তাঁদের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হবে এবং কেউ অপরাধে জড়িত প্রমাণিত হলে তাঁর বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আইনগত ব্যবস্থা ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
মোহাম্মদপুরের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট থানা, পুলিশ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর পদক্ষেপ চান ভুক্তভোগীরা। তাঁদের দাবি, অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
একই সঙ্গে অভিযোগকারী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অভিযোগের পক্ষে থাকা নথি সংগ্রহ এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য গ্রহণের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
তাঁদের প্রত্যাশা, মোহাম্মদপুরে এমন পরিবেশ গড়ে উঠবে, যেখানে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা কোনো ধরনের ভয়ভীতি ছাড়াই জীবিকা নির্বাহ করতে পারবেন।
প্রতিবেদকের বক্তব্য
এ প্রতিবেদনে উল্লিখিত বিষয়গুলো ভুক্তভোগীদের বক্তব্য ও প্রাপ্ত অভিযোগপত্রের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অভিযুক্ত জাহিদ রহমান জনের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট থানায় অভিযোগ বা মামলা থাকার তথ্য, রাজনৈতিক পরিচয়সংক্রান্ত নথি এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য যাচাই করা জরুরি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করা সমীচীন নয়।
মন্তব্য করুন