সায়মন খান | লিড নিউজ ২৪লঃ
প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) এক শিক্ষকের ১৩ বছর বয়সী স্কুলপড়ুয়া ছেলেকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, মায়ের একটি দামি আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই তাকে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা।
নিখোঁজ হওয়ার এক দিন পর শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার জঙ্গল থেকে ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতীম নামের ওই কিশোরের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তার মাথায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।নিহত ইশায়াত কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগম এবং কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র সন্তান। সে কোটবাড়ী এলাকার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। পরিবার নিয়ে সে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কোটবাড়ী এলাকাতেই থাকত।
যেভাবে নিখোঁজ হয় ইশায়াত পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বেলা আড়াইটার দিকে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা বলে মায়ের ব্যবহৃত আইফোনটি নিয়ে বাসা থেকে বের হয় ইশায়াত। কিন্তু বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলেও সে আর বাসায় ফেরেনি। ছেলের খোঁজ না পেয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে তার মুঠোফোনের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা করা হয়। শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন কোটবাড়ী এলাকার গন্ধমতীতে ফোনটির সর্বশেষ অবস্থান শনাক্ত করা গেলেও এরপর থেকেই সেটি পুরোপুরি বন্ধ পাওয়া যায়।
উদ্বেগ থেকে বিষাদ: উদ্ধার হলো মরদেহ ছেলের সন্ধান না পেয়ে শুক্রবারই কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন ইশায়াতের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার। নিখোঁজের পর থেকেই পুলিশ, ডিবি ও স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি।
শনিবার বেলা একটার দিকে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার জঙ্গলে ইশায়াতের মরদেহ পড়ে থাকার খবর পায় পুলিশ। পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে। কিশোর ইশায়াত কীভাবে ওই জঙ্গলে পৌঁছাল এবং কীভাবে তার মৃত্যু হলো—তা নিয়ে এখনও রহস্য রয়ে গেছে।
‘মুক্তিপণ চাইলে ১০টা ফোন দিতাম’ একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে দিশাহারা ইশায়াতের পরিবার। এই অকালমৃত্যুতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝেও নেমে এসেছে শোকের ছায়া। ক্ষুব্ধ শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা অবিলম্বে এই হত্যাকাণ্ডের কারণ উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। হৃদয়বিদারক এই ঘটনায় ফেসবুকে আবেগঘন একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসান খান। তিনি লিখেছেন, ‘শুধুমাত্র একটি আইফোনের জন্য ছেলেটাকে মেরে ফেললি। এইরকম ১০টা ফোন মুক্তিপণ হিসেবে চাইতি—আমরা দিতাম। নিখোঁজ অপ্রতীমকে মেরে ফেলা হয়েছে। হে আল্লাহ বাবা-মাকে ধৈর্য ধরার তৌফিক দান করুন।’
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক আবদুল হাকিম বলেন, ‘বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের একমাত্র ছেলের এমন মৃত্যু আমরা কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। পুরো বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার এই ঘটনায় শোকাহত। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ছেলেটিকে আর জীবিত পেলাম না। তার সঙ্গে থাকা মায়ের আইফোনটিও পাওয়া যায়নি।’
যা বলছে পুলিশ কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রকিবুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে জানান, ‘ঘটনার শুরু থেকেই পুলিশ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হবে। হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তদন্তের পর বিস্তারিত জানানো সম্ভব হবে।’
মন্তব্য করুন