জেলার বিরল উপজেলার রুদ্রপুর গ্রামে অবস্থিত ব্যতিক্রমধর্মী মাটির স্কুলটি গ্রামীণ শিক্ষার প্রসারে এবং পরিবেশ বান্ধব নির্মাণ শৈলীর জন্য বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত ও দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
সম্প্রতি দিনাজপুর বিরল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রেজাউল ইসলাম স্কুলটি পরিদর্শন করে শিক্ষার্থীদের সাথে সরাসরি ক্লাসে অংশ নিয়েছিলেন।
তিনি গতকাল রোববার বাসস’কে বলেন, দীপশিখা মেটি স্কুল বাংলাদেশের পরিবেশ বান্ধব ও টেকসই স্থাপত্য শৈলীর এক অনন্য ও আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত হয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
অনগ্রসর জেলার বিরল উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে রুদ্রপুর গ্রামের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে ১৯৯৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর ‘দীপশিখা’ (নন-ফরমাল এডুকেশন ট্রেনিং অ্যান্ড রিসার্চ সোসাইটি ফর ভিলেজ ডেভেলপমেন্ট) নামক একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার উদ্যোগে এই স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এটি মূলত ‘মডার্ন এডুকেশন অ্যান্ড ট্রেনিং ইনস্টিটিউট’ এর গ্রামীণ পর্যায়ে অনগ্রসর এলাকায়, শিক্ষার জন্য ব্যতিক্রমধর্মী একটি প্রকল্প।
স্থানীয় মঙ্গলপুর ইউপি সদস্য মো. সোলাইমান আলী জানান, পূর্বে এই গ্রামের শিশুদের প্রায় ৬ থেকে ৭ কিলোমিটার পথ পাঁয়ে হেঁটে পাশের গ্রামের স্কুলে যেতে হতো। যার ফলে অনেকেই মাঝ পথে পড়া শোনা বাদ দিয়ে ঝরে পড়ে যেতো। ব্যতিক্রমধর্মী ও পরিবেশ বান্ধব স্থাপত্য শৈলী স্কুলটির মূল আকর্ষণ হলো এর সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ও পরিবেশবান্ধব উপাদান দিয়ে তৈরি দ্বিতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। যা গত ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নির্মাণ শুরু হয়ে ২০০৬ সালে ডিসেম্বরে সম্পন্ন হয়। ভবনটি নির্মাণে কোনো আধুনিক ইট-সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়নি। এতে প্রধান উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, স্থানীয় কাদা-মাটি, বালু, খড়, বাঁশ, দড়ি ও কাঠ দিয়ে। মাটি ও খড় মেশানো কাদা দিয়ে এর মজবুত দেয়াল তৈরি করা হয়েছে।
আর্দ্রতা দূর করতে দেয়ালের নিচের অংশে বিশেষ প্লাস্টার এবং মেঝেতে ওয়াটার-প্রুফ হিসেবে পাম অয়েল ও সাবানের মিশ্রণ ব্যবহার করা হয়েছে। দোতলার মেঝে ও ছাদটি তৈরি হয়েছে শক্ত বাঁশের পাটাতন, চাটাই এবং কাঠের নিখুঁত বুননে। বৃষ্টির পানি থেকে সুরক্ষার জন্য একেবারে উপরে টিনের
ছাউনি রয়েছে। মাটির তৈরি মোটা দেয়াল ও বাঁশের সুচারু ব্যবহারের কারণে বাইরের তীব্র গরম বা শীতের অনুভূতি ভিতরে পৌঁছায় না। গরমের দিনে ভিতরের পরিবেশ চমৎকার ঠাণ্ডা এবং শীতের দিনে আরামদায়ক উষ্ণতা থাকে।
দীপশিখার নির্বাহী পরিচালক জগদীস চন্দ্র রায় বাসস’কে বলেন, স্কুলটির অসাধারণ নকশা করে ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার লিজ ইউনিভার্সিটির তৎকালীন গবেষক ও জার্মান স্থপতি আনা হেরিঙ্গার এবং স্থপতি আইকে রোজওয়াগ। স্থানীয় ১৯ জন রাজমিস্ত্রি ও শ্রমিকদের সাথে নিয়ে তারা এই ব্যতিক্রমধর্মী স্কুলটি নির্মাণ করেন।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও পুরস্কার এই অনন্য স্থাপত্য শৈলী আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। বেশ কিছু সম্মানজনক পুরস্কার লাভ করেছে। এসবের মধ্যে আগা খান স্থাপত্য পুরস্কার ২০০৭ সালে পরিবেশ বান্ধব, টেকসই এবং মানবিক স্থাপত্যের জন্য স্কুলটি এই মর্যাদাপূর্ণ বৈশ্বিক পুরস্কার লাভ করে। একই সাথে এর নির্মাণে জড়িত ১৮জন স্থানীয় শ্রমিককে পুরস্কৃত করা হয়েছে। কারি স্টোন নকশা পুরস্কার এটিও স্কুলটির টেকসই সামাজিক ও পরিবেশগত স্থাপত্যের জন্য প্রদান করা হয়।
সূত্রটি জানায়, আধুনিক ও আনন্দময় শিক্ষা ব্যবস্থা দীপশিখা মেটি স্কুলের পড়া শোনার ধরণ প্রথাগত স্কুল গুলোর চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। ভীতিহীন পরিবেশে আনন্দের মাধ্যমে শিক্ষাদান, দলগতভাবে কাজ করার মানসিকতা তৈরি এবং শিক্ষার্থীদের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটানো।
বর্তমানে এখানে শিশু শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করানো হয়। সাধারণ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিয়মিত নাচ, গান, অভিনয়, চিত্রাঙ্কন, ইংরেজি ভাষা এবং নানাবিধ হাতের কাজ শেখানো হয়। যেন শিক্ষার্থীরা নিজেদের প্রচেষ্টায় স্বাবলম্বী হতে পারে। শিশুদের খেলার ছলে শেখার জন্য নিচতলায় গুহার মতো চমৎকার কিছু উন্মুক্ত কক্ষ বা ‘বোল্ট-হোল’ রাখা হয়েছে। সেখানে শিক্ষার্থীরা নিজেদের মধ্য তথ্য আদান-প্রদান ও খেলাধুলা করতে পারে।
বিরল উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রেজাউল ইসলামের মতো সরকারি কর্মকর্তাদের এমন নিয়মিত পরিদর্শনের ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের এই আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠানটি আরও উৎসাহিত হবে। সেই সাথে গ্রামীণ শিক্ষার গুণগতমান ধরে রাখতে বড় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
মন্তব্য করুন