তিন মাসের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক স্বাধীন সচিবালয় করার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হয়েছে। মঙ্গলবার ১৮৫ পৃষ্ঠার ওই রায় পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়।
রায়ে কয়েকটি নির্দেশনা দিয়েছেন আদালত। সেগুলো হলো-
ক) সংবিধান (পঞ্চদশ সংশোধনী) আইন, ২০১১ (২০১১ সালের আইন XIV)-এর ৩৯ ধারা দ্বারা সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের সংশোধনীকে এতদ্বারা সংবিধানের এখতিয়ার বহির্ভূত এবং বাতিল বলে ঘোষণা করা হলো।
২. তদনুসারে, সংবিধান (চতুর্থ সংশোধনী) আইন, ১৯৭৫ (১৯৭৫ সালের আইন নং II)-এর ১৯ ধারা (ইংরেজি সংস্করণের ২০ ধারা) দ্বারা সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের সংশোধনীকেও এখতিয়ার বহির্ভূত এবং বাতিল বলে ঘোষণা করা হলো।
অধিকন্তু, অনুচ্ছেদ ১১৬-এর উল্লিখিত সংশোধনীসমূহকে সংবিধানের পরিপন্থী (ultra vires) ঘোষণা করার পরিপ্রেক্ষিতে এবং ৮ম ও ১৬তম সংশোধনী মামলার সিদ্ধান্ত অনুসারে, বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত অনুচ্ছেদ ১১৬ স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনরুজ্জীবিত ও পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশের মূল ১৯৭২ সালের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১৬ এতদ্বারা নিম্নরূপে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা হলো:
অনুচ্ছেদ ১১৬- বিচার বিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিগণ এবং বিচারিক কার্য সম্পাদনকারী ম্যাজিস্ট্রেটগণের নিয়ন্ত্রণ (পদায়ন, পদোন্নতি এবং ছুটি মঞ্জুর করার ক্ষমতা সহ) এবং শৃঙ্খলা বিধানের ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের উপর ন্যস্ত থাকবে।
গ) ‘বাংলাদেশ বিচার বিভাগীয় সার্ভিস (শৃঙ্খলা বিধিমালা) ২০১৭’ এতদ্দ্বারা সংবিধানের পরিপন্থি (ultra vires) বলে ঘোষণা করা হলো, যেহেতু এটি সংবিধানের পুনঃস্থাপিত ১১৬ নং অনুচ্ছেদের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং ৫২ ডিএলআর (এডি) ৮২-তে প্রকাশিত মাসদার হোসেন মামলায় প্রতিষ্ঠিত বিচারিক স্বাধীনতার নির্দেশিকার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
ঘ) অধিকন্তু, ১-৩ নং প্রতিবাদীগণকে (এতদ্দ্বারা নির্দেশ দেওয়া হলো যে, তারা সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃপক্ষের প্রস্তাব অনুযায়ী, আজ থেকে ৩ (তিন) মাসের মধ্যে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জন্য একটি স্বাধীন পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করবে।
এর আগে ২ সেপ্টেম্বর বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর বেঞ্চ এই রায় দেন।
আদালতে রিটকারীদের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। অ্যামিকাস কিউরি ছিলেন সিনিয়র অ্যাডভোকেট শরীফ ভূইয়া। আর রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান।
২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ এবং ২০১৭ সালের জুডিশিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে, বিচার বিভাগীয় পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে সাতজন আইনজীবী রিট দায়ের করেন। পরে একই বছরের ২৭ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করেন।
সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিচারকর্মে নিয়োজিত ব্যক্তিদের এবং বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব পালনরত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি ও ছুটি মঞ্জুরিসহ) ও শৃঙ্খলা বিধানের দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত। রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে তা প্রয়োগ করেন।
রিটকারীদের আইনজীবীর মতে, ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অধস্তন আদালতের দায়িত্ব পালনরত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধানের দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত রয়েছে।
একই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি এ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করবেন। মূলত রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত এ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের সরাসরি হস্তক্ষেপ দেখা যায়, যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
১৯৭২ সালের সংবিধানে অধস্তন আদালতের দায়িত্ব পালনরত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধানের দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত ছিল।
১৯৭৪ সালের সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনের মাধ্যমে ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধানের দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত করা হয়। পরে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনের মাধ্যমে এবং ‘সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তা প্রয়োগ করা হবে’ শব্দগুলো সংযুক্ত করা হয়।
এরপর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ পঞ্চম সংশোধনী আইন অসাংবিধানিক ঘোষণা করলে, পঞ্চদশ সংশোধনী আইন, ২০১১-এর মাধ্যমে ১১৬ অনুচ্ছেদের বর্তমান বিধান প্রতিস্থাপন করা হয়।
বর্তমানে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে এ বিধানই বিদ্যমান রয়েছে।
মন্তব্য করুন