জবি প্রতিনিধি
জনবল সংকট, অপর্যাপ্ত বাজেট, নিম্ন বেতন, প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাব এবং দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তায় নানা সংকটের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) একমাত্র ডে-কেয়ার সেন্টার। আটটি ছোট কক্ষে পরিচালিত এই সেন্টারে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা না থাকায় শিশুদের মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
২০১৮ সালের ৩ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ডরমিটরি ভবনের তৃতীয় তলায় যাত্রা শুরু করে ডে-কেয়ার সেন্টারটি। প্রতিষ্ঠার আট বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো স্থায়ী নীতিমালা, পর্যাপ্ত বাজেট ও প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত হয়নি। এরই মধ্যে পরিচালনা কমিটির মেয়াদ শেষ হলেও নতুন কমিটি গঠন না হওয়ায় প্রশাসনিক কার্যক্রম ও উন্নয়ন পরিকল্পনা স্থবির হয়ে রয়েছে।
বর্তমানে সেন্টারটিতে নিবন্ধিত শিশু রয়েছে ৪০ জন। নিয়মিত উপস্থিত থাকে প্রায় ১৬ জন। অথচ তাদের দেখভালের দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র তিনজন কর্মচারী। ভর্তি ও মাসিক ফি থেকে আয় হলেও কর্মীদের বেতন অত্যন্ত কম। ভর্তি ফি তিন হাজার টাকা। এরপর দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য মাসিক ফি তিন হাজার এবং দুই বছরের বেশি বয়সীদের জন্য দুই হাজার টাকা নির্ধারিত। বিপরীতে তিন কর্মচারীর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মাসিক ব্যয় মাত্র ৩৭ হাজার টাকা। এর মধ্যে সুপারভাইজারের বেতন ১৭ হাজার এবং দুই সহকারীর বেতন ১০ হাজার টাকা করে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, করোনা মহামারির সময় দীর্ঘদিন কর্মচারীদের বেতন বন্ধ ছিল। ইউজিসির নির্ধারিত বেতন কাঠামোর আওতায় না থাকায় গত চার বছরেও তাদের বেতন বৃদ্ধি হয়নি।
ডে-কেয়ারের মহিলা সুপারভাইজার শাকিলা জামান সুবর্ণা বলেন, “মাত্র তিনজন কর্মচারী দিয়ে সব শিশুর দেখাশোনা করতে হয়। বর্তমান বেতনে সংসার চালানো কঠিন। দীর্ঘদিন ধরে জনবল ও বেতন বৃদ্ধির দাবি জানানো হলেও কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। খেলনা, শিক্ষাসামগ্রী ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামেরও সংকট রয়েছে। শিশুদের জন্য আলাদা বিশ্রামাগার, ডাইনিং কর্নার, পর্যাপ্ত এসি, গিজার, কম্পিউটার, প্রিন্টার এবং আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। ২০২৪ সালে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক সাদেকা হালিম দায়িত্ব নেওয়ার পর কিছু উন্নয়ন হলেও তা স্থায়ী হয়নি। পর্যাপ্ত সুবিধার অভাবে ২০২৫ সালের ১২ আগস্ট থেকে শিশুদের গোসল করানোর ব্যবস্থাও বন্ধ রয়েছে।”
ডে-কেয়ারটিতে শিশুদের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা ও মানসিক বিকাশের সুযোগও সীমিত। নেই কোনো সাধারণ শিক্ষক কিংবা গান ও নাচের প্রশিক্ষক। পর্যাপ্ত খেলনা ও বিনোদন সামগ্রীর অভাবে শিশুদের সৃজনশীল বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করছেন অভিভাবকরা।
অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মধ্যে রয়েছে পৃথক বিশ্রামাগার ও ডাইনিং কর্নারের অভাব, অপর্যাপ্ত শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, গিজার না থাকা, নিম্নমানের টয়লেট এবং দাপ্তরিক কাজের জন্য কম্পিউটার ও প্রিন্টারের সংকট। এছাড়া পর্যাপ্ত সিসিটিভি ক্যামেরা ও আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাও নেই।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, বর্তমান উপাচার্য দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় পাঁচ মাস পার হলেও এখনো ডে-কেয়ার সেন্টার পরিদর্শনে যাননি। ফলে দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর সমাধানও এগোয়নি।
বর্তমানে এই সেন্টারের সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৫ জন শিক্ষক-কর্মকর্তা এবং একজন শিক্ষার্থী। তবে যথাযথ প্রচারের অভাবে অধিকাংশ শিক্ষক-শিক্ষার্থীই ডে-কেয়ার সেন্টারের অস্তিত্ব সম্পর্কে অবগত নন।
এক অভিভাবক বলেন, “আমরা দুজনই চাকরিজীবী। বাসায় সন্তানকে দেখাশোনার কেউ না থাকায় ডে-কেয়ারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। পরিবেশ ভালো হলেও জনবল, নিরাপত্তা ও শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা আরও বাড়ানো জরুরি।”
ডে-কেয়ারটি নতুন একাডেমিক ভবনে স্থানান্তরের পরিকল্পনা থাকলেও শ্রেণিকক্ষ সংকটের কারণে তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।
ডে-কেয়ারের পরিচালক অধ্যাপক ড. হোসনে আরা বেগম বলেন, “সবচেয়ে বড় সমস্যা অর্থসংকট। পর্যাপ্ত বাজেট না থাকায় জনবল বাড়ানো বা অবকাঠামোর উন্নয়ন সম্ভব হচ্ছে না। কমিটির সদস্যদের কোনো সম্মানী না থাকায় দায়িত্ব নিতেও অনেকে আগ্রহী হন না। নতুন কমিটি গঠনের জন্য উপাচার্যের কাছে আবেদন করা হলেও এখনো কোনো অগ্রগতি হয়নি। প্রয়োজনীয় বাজেট পেলে ডে-কেয়ারে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব।”
এর আগে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম জনবল, বেতন ও শিশুদের স্বাস্থ্য-নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিলেও এখনো তার বাস্তবায়ন হয়নি বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
এ বিষয়ে বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. রইছ উদ্দীনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই সেবাকেন্দ্রকে কার্যকর করতে হলে দ্রুত জনবল বৃদ্ধি, কর্মচারীদের বেতন বৈষম্য নিরসন, পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরী।
মন্তব্য করুন