বগুড়ায় গ্রুপ ক্যাপ্টেন (অব.) এম শওকত ইসলাম রচিত আত্মজৈবনিক গ্রন্থ অবিশ্বাস্য এক যাত্রা-এর মোড়ক উন্মোচন করা হয়েছে। সোমবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শহরের হোটেল নাজ গার্ডেনের মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বইটির আনুষ্ঠানিক মোড়ক উন্মোচন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন দৈনিক করতোয়ার সম্পাদক মোজাম্মেল হক লালু। সাংবাদিক ইউনিয়ন বগুড়ার সভাপতি গণেশ দাসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বগুড়া প্রেসক্লাবের সভাপতি রেজাউল হাসান রানু ও সাধারণ সম্পাদক কালাম আজাদ।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বইটির প্রকাশক আহমদ সারওয়ারুদ্দৌলা। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সাংবাদিক ইউনিয়ন বগুড়ার সাধারণ সম্পাদক এস এম আবু সাঈদ।
এ সময় হোটেল নাজ গার্ডেনের স্বত্বাধিকারী মো. শোকরানসহ বগুড়ায় কর্মরত প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক্স গণমাধ্যমের সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে লেখক এম শওকত ইসলাম তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন, যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতা ও পারিবারিক স্মৃতিচারণ তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, বইটি মূলত তাঁর জীবনের নানা উত্থান-পতন, দায়িত্ববোধ, দেশপ্রেম ও অভিজ্ঞতার নির্যাস। একজন ফাইটার পাইলট, সামরিক কর্মকর্তা ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে জীবনের বিভিন্ন অধ্যায় তিনি বইটিতে তুলে ধরেছেন।
প্রকাশক আহমদ সারওয়ারুদ্দৌলা বলেন, অবিশ্বাস্য এক যাত্রা শুধু একটি আত্মজীবনী নয়, এটি একই সঙ্গে ইতিহাস, অভিজ্ঞতা ও মানবিক সংগ্রামের দলিল।
তিনি বলেন, এই বইয়ে এমন সব বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা উঠে এসেছে, যা অনেক সময় কল্পকাহিনীকেও হার মানায়। যুদ্ধের আকাশ থেকে প্রশাসনের অন্দরমহল পর্যন্ত একজন মানুষের দীর্ঘ পথচলার গল্প এতে পাওয়া যাবে।
তিনি আরও বলেন, বইটিতে ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে লেখকের দায়িত্ব পালন, যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতা,ফাইটার পাইলটদের প্রশিক্ষণ ও স্কোয়াড্রন জীবনের নানা দিক বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে। পাশাপাশি স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রথম দিককার গঠন প্রক্রিয়া ও অভ্যন্তরীণ অভিজ্ঞতাও এতে স্থান পেয়েছে।
প্রকাশকের ভাষ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের ভেতরের নানা বাস্তবতা, টানাপোড়েন, ষড়যন্ত্র ও প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকার সংগ্রামের কথাও বইটিতে অকপটে তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর মতে, নেতৃত্ব, সংকট মোকাবিলা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও মানবিক মূল্যবোধের নানা শিক্ষা বইটিকে শুধু ইতিহাস বা সামরিক বিষয়ে আগ্রহী পাঠকদের জন্য নয়, করপোরেট ও পেশাজীবী মানুষের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলবে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, বর্তমান প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধ, সামরিক জীবন ও স্বাধীনতা-পরবর্তী রাষ্ট্রগঠনের নানা অজানা অধ্যায় তুলে ধরতে এ ধরনের আত্মজৈবনিক গ্রন্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একজন প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞ মানুষের স্মৃতিচারণ ইতিহাসের অনেক অনুল্লিখিত দিককে সামনে নিয়ে আসে।
লেখক এম শওকত ইসলাম ১৯৪০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার নারচি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে বগুড়ার শিক্ষাবান্ধব পরিবেশে। তিনি চকযাদু ফ্রি প্রাইমারি স্কুল, করনেশন হাই স্কুল ও বগুড়া জিলা স্কুলে পড়াশোনা করেন। পরে রাজশাহী সরকারি কলেজ ও আজিজুল হক কলেজে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন।
লেখকের পরিবার পূর্ব বগুড়ার একটি শিক্ষিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত পরিবার হিসেবে পরিচিত। তাঁর বাবা আবদুস সামাদ ছিলেন ডাক বিভাগের কর্মকর্তা। মা হেমায়েতুন নেছা ছিলেন সমাজসেবামূলক কর্মকা-ে নিবেদিত প্রাণ। মুক্তিযুদ্ধের সময় সন্তানদের যুদ্ধে যেতে উৎসাহিত করার মধ্য দিয়ে তিনি সাহসী ও দেশপ্রেমিক মানসিকতার পরিচয় দেন।
লেখকের দাদা মো. শরাফত উল্লাহ আহমেদ ছিলেন অঞ্চলের একজন সুপরিচিত শিক্ষক ও সমাজসেবক। দীর্ঘ সময় তিনি ইউনিয়ন বোর্ডের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষা, নৈতিকতা ও সমাজসেবার যে পারিবারিক ঐতিহ্যের মধ্যে লেখক বেড়ে উঠেছেন, তার প্রভাব তাঁর জীবন ও কর্মে প্রতিফলিত হয়েছে বলে অনুষ্ঠানে বক্তারা উল্লেখ করেন।
পারিবারিক জীবনে এম শওকত ইসলাম একজন মূল্যবোধসম্পন্ন ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে পরিচিত। তাঁর স্ত্রী মিসেস খুরশিদা শওকাত (নাজমা) দীর্ঘ জীবনের সহযাত্রী। তাঁদের তিন সন্তান নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। পরিবারের নতুন প্রজন্মও দেশের বাইরে উচ্চশিক্ষা ও বিভিন্ন পেশায় কৃতিত্বের সঙ্গে কাজ করছেন।
অনুষ্ঠান শেষে অতিথিরা বইটির সফলতা কামনা করেন এবং পাঠকদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতাভিত্তিক গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন।
মন্তব্য করুন