আজ ২৫ বৈশাখ। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বহুমাত্রিক উৎকর্ষের মহানায়ক, নোবেলজয়ী বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মজয়ন্তী।
সময়ের হিসাবে ১৬৫ বছর পেরিয়ে গেলেও কবিগুরু আজও বাঙালির মনন, সংস্কৃতি ও জীবনবোধে সমানভাবে জীবন্ত। ১২৬৮ বঙ্গাব্দের ২৫ বৈশাখ, ইংরেজি ৭ মে ১৮৬১ সালে কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের এই উজ্জ্বল নক্ষত্র।
দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সারদাসুন্দরী দেবীর সন্তান রবীন্দ্রনাথ শৈশবেই অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দেন। মাত্র আট বছর বয়সে কবিতা লেখা শুরু করা সেই শিশুই পরবর্তীতে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।
রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একাধারে কবি, কথাশিল্পী, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, সুরস্রষ্টা, শিক্ষাচিন্তক, ভাষাবিদ, চিত্রশিল্পী, দার্শনিক ও মানবতাবাদী। তার সৃষ্টিকর্মের পরিধি যেমন বিস্তৃত, তেমনি গভীরতাও অসাধারণ। তিনি রচনা করেছেন ৫২টি কাব্যগ্রন্থ, ৩৮টি নাটক, ১৩টি উপন্যাস, ৩৬টি প্রবন্ধগ্রন্থ, অসংখ্য ছোটগল্প, চিঠিপত্র এবং ২ হাজারের বেশি গান। বাংলা সাহিত্যে এমন বহুমাত্রিক প্রতিভার উদাহরণ খুবই বিরল।
তার সাহিত্যকর্মে মানুষের আনন্দ-বেদনা, প্রেম-বিরহ, নিঃসঙ্গতা, প্রতিবাদ এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষাসহ মানবজীবনের নানা অনুভূতি গভীরভাবে উঠে এসেছে।
বাংলাদেশের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক আত্মীয়তার চেয়েও গভীরতর। তার পূর্বপুরুষরা খুলনার রূপসা উপজেলার পিঠাভোগে বসবাস করতেন। জমিদারি তদারকির কাজে তিনি দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন কুষ্টিয়ার শিলাইদহ, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর ও নওগাঁর পতিসরসহ বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে। বাংলাদেশের প্রকৃতি, মানুষ ও জনজীবন তার সাহিত্যকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ রবীন্দ্রনাথেরই রচনা। এর মধ্য দিয়ে এই ভূখণ্ডের সঙ্গে তার সম্পর্ক রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পেয়েছে।
রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার অর্জন শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বাংলা ভাষার বিশ্বস্বীকৃতিরও এক ঐতিহাসিক ঘটনা। ১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা ভাষাকে বিশ্বমঞ্চে বিশেষ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেন। এই অর্জন আজও বাঙালির অন্যতম সাংস্কৃতিক গর্ব।
জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আজ দেশব্যাপী নানা আয়োজনে স্মরণ করা হচ্ছে কবিগুরুকে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় যথাযথ মর্যাদা ও উৎসবমুখর পরিবেশে দিবসটি উদ্যাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। এবারের প্রতিপাদ্য ‘শান্তি ও মানবতার কবি রবীন্দ্রনাথ’।
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে কুষ্টিয়ার শিলাইদহসহ কবির স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন জেলায় নেওয়া হয়েছে রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি। এ বছর কুষ্টিয়ার শিলাইদহে তিন দিনব্যাপী জাতীয় পর্যায়ের মূল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী।
কুষ্টিয়ার পাশাপাশি কবির স্মৃতিবিজড়িত নওগাঁর পতিসরেও আয়োজন করা হয়েছে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালা।
সেখানে উপস্থিত থাকবেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম।
সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর।
এ ছাড়া খুলনার দক্ষিণডিহিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
জাতীয় পর্যায়ের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির ব্যবস্থাপনায় প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হবে। এতে থাকবে নৃত্য, সংগীত ও আবৃত্তি।
ঢাকাসহ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও রচনা প্রতিযোগিতার মাধ্যমে দিবসটি পালন করা হবে। একই সঙ্গে কবির ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও বাংলা একাডেমি বিশেষ স্মরণিকা ও পোস্টার মুদ্রণ ও বিতরণ করেছে।
বরাবরের মতো ছায়ানটও বিশেষ আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিবসটি উদ্যাপন করছে।
এদিকে কবির জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আগামী ২৮ বৈশাখ (১১ মে) বাংলা একাডেমি ‘রবীন্দ্র পুরস্কার ২০২৬’ প্রদান করবে। এবার রবীন্দ্রসাহিত্য গবেষণায় অধ্যাপক নৃপেন্দ্রলাল দাশ এবং রবীন্দ্রসংগীত চর্চায় শিল্পী বুলবুল ইসলাম এ পুরস্কার পাচ্ছেন।
মন্তব্য করুন