সার সংরক্ষণ, সুষ্ঠু বিতরণ এবং কৃষকের দোরগোড়ায় দ্রুত সার পৌঁছে দিতে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) বাস্তবায়নাধীন দেশের বিভিন্ন স্থানে ৩৪টি আধুনিক বাফার সার গুদাম নির্মাণ প্রকল্পে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।
বাংলাদেশের কৃষিকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা এবং সার সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ‘সার সংরক্ষণ ও বিতরণ সুবিধার্থে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ৩৪টি বাফার গুদাম নির্মাণ (১ম সংশোধিত)’ প্রকল্পটি সরকারি অর্থায়নে নেওয়া হয়। ১ হাজার ৯৮৩ কোটি ৩ লাখ ৯৬ হাজার টাকা ব্যয়ে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২১ সালের জুন মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য ২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর একনেক সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন পায়।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, করোনাকালে কাজ শেষ না হওয়ায় পরিকল্পনা কমিশন ব্যয় না বাড়িয়ে প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ায়। পরে ২০২৩ সালের ১১ এপ্রিল একনেক সভায় ২ হাজার ৪৮২ কোটি ৮৪ লাখ ৪৬ হাজার টাকা ব্যয়ে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদ নির্ধারণ করে প্রথম সংশোধিত ডিপিপি অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর ২০২৫ সালের ১৯ জুন ব্যয় না বাড়িয়ে প্রকল্পের মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়।
প্রকল্পটি ৩৪টি জেলায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। জেলাগুলো হলো- সিরাজগঞ্জ, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, যশোর, নড়াইল, মাগুরা, খুলনা, সাতক্ষীরা, বগুড়া, নওগাঁ, গাইবান্ধা, রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, জয়পুরহাট, রাজশাহী, নাটোর, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা, কুমিল্লা, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, মানিকগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জ।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ৩৪টি গুদামের মোট ধারণক্ষমতা হবে ৫ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন। চারটি ক্যাটাগরিতে এসব গুদাম নির্মাণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে ২৫ হাজার মেট্রিক টনের ৪টি, ২০ হাজার মেট্রিক টনের ৮টি, ১৫ হাজার মেট্রিক টনের ৬টি এবং ১০ হাজার মেট্রিক টনের ১৬টি গুদাম রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মঞ্জুরুল হক বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-কে বলেন, প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে ৩৩টি জেলার ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। ২০টির নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। কুষ্টিয়া জেলায় ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া এখনও চলছে এবং শিগগিরই নিয়ম অনুযায়ী তা সম্পন্ন হবে।
তিনি বলেন, এটি দেশের কৃষি খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প। এসব গুদাম চালু হলে স্থানীয়ভাবে সার সংরক্ষণ সহজ হবে, কৃষকরা সময়মতো সার পাবে এবং পরিবহন ব্যয়ও অনেক কমে আসবে।
তিনি আরও বলেন, ‘কৃষক যাবে না সারের কাছে, সার যাবে কৃষকের কাছে’—এই লক্ষ্য সামনে রেখেই দেশের ৩৪ জেলায় গুদামগুলো নির্মাণ করা হচ্ছে।
প্রকল্প পরিচালক জানান, ভূমি অধিগ্রহণসহ নানা জটিলতায় প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় কিছুটা বেড়েছে। তবে বর্তমানে কাজের মান নিশ্চিত ও সময়মতো শেষ করতে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। নির্মাণকাজ তদারকিতে বিসিআইসি চারটি মনিটরিং কমিটি গঠন করেছে। প্রতিটি কমিটি তিন সদস্যবিশিষ্ট। তারা নির্দিষ্ট সময় অন্তর বিভিন্ন প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দাখিল করছে।
এ ছাড়া মন্ত্রণালয়, প্রকল্প পরিচালক কার্যালয় ও সংশ্লিষ্ট সাইটের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখতে সিসিটিভি নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। প্রতিটি সাইটে পৃথক মনিটরিং টিমও কাজ করছে।
কর্মকর্তারা জানান, জমি অধিগ্রহণে নানা জটিলতার কারণে সময় বেশি লেগেছে। এর মধ্যে ছিল প্রস্তাবিত জমিতে বৈদ্যুতিক খুঁটি, রেলওয়ের জমি, খাস জমি, নদী শ্রেণিভুক্ত জমি, রাস্তা-সংক্রান্ত সমস্যা, পরিবেশ ছাড়পত্র পেতে বিলম্ব এবং স্থানীয় জনগণ ও জনপ্রতিনিধিদের স্থান পরিবর্তনের প্রস্তাব।
বিসিআইসি সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশে ইউরিয়া সারের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ২৫ লাখ মেট্রিক টন। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় অতিরিক্ত ৮ লাখ মেট্রিক টন সার মজুদ রাখতে হয়। অর্থাৎ মোট ৩৩ লাখ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার সরবরাহ ও মজুদ কার্যক্রম বিসিআইসি’র মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
বর্তমানে বিসিআইসি’র ২৫টি গুদামে প্রায় ৩ লাখ ৭ হাজার মেট্রিক টন সার সংরক্ষণের সুযোগ রয়েছে। ফলে সারা বছরই সারের বড় একটি অংশ গুদাম চত্বরে ও পরিবহন ঠিকাদারের তত্ত্বাবধানে রাখতে হয়। খোলা জায়গায় রাখার কারণে সার জমাট বেঁধে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন বিসিআইসি’র ৬টি ইউরিয়া সার কারখানায় বর্তমানে বছরে প্রায় ১০ লাখ মেট্রিক টন সার উৎপাদিত হয়। অবশিষ্ট চাহিদা পূরণে বিদেশ থেকে সার আমদানি করা হয়।
দেশের প্রান্তিক কৃষকদের মধ্যে সার সরবরাহ করা পর্যন্ত বিএডিসি’র ২৪টি আপৎকালীন গুদাম সংরক্ষণের কাজে ব্যবহৃত হয়। এসব গুদামের মোট ধারণক্ষমতা ১ লাখ ৪৫ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন। কিন্তু প্রতি বছর এসব গুদাম থেকে ১৭ থেকে ১৮ লাখ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার কৃষকদের কাছে সরবরাহ করা হয়।
প্রকল্প পরিচালক মঞ্জুরুল হক জানান, ৩৪টি বাফার গুদাম নির্মাণ শেষ হলে আরও ৫ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন সার মজুদের সক্ষমতা যুক্ত হবে। এতে সারের পিক সিজনে কমপক্ষে ৮ লাখ মেট্রিক টন মজুদ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে কৃষকের কাছে সময়মতো সার পৌঁছে দেওয়া যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
মন্তব্য করুন