চা বাগানের জন্য বিখ্যাত সিলেট অঞ্চল। এর মধ্যে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলেই বিশাল বিশাল চা বাগান চোখে পড়ে। কৌতূহলবশত ঢুকে পড়ি চা বাগানে কর্মরত শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলতে। এদের অধিকাংশই নারী। এক নারী শ্রমিকের সঙ্গে আলাপকালে একটা বিষয় অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করলাম-নারী শ্রমিকদের ছোটো ছোটো শিশুরা চা বাগানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেউ মাটিতে বসে খেলা করছে। কেউ বা ছুটোছুটি করছে।
কয়েকটি ছোট বাচ্চাকে দেখা গেল, মায়ের সঙ্গে বাগান থেকে চা পাতা তোলার চেষ্টা করছে। এভাবেই হয়ত ওরা একদিন মনের অজান্তেই চা বাগানের শ্রমিকে পরিণত হবে। অথচ ওদের সবারই স্কুলে যাওয়ার বয়স হয়েছে। একজন নারী শ্রমিকের কাছে জানতে চাইলাম, বাচ্চারা স্কুলে যায় কিনা? জবাবে তিনি বলেন, গরিব মানুষ, বাচ্চাদের লেখাপড়া করানোর মতো সামর্থ্য আমাদের নেই। এ ছাড়া স্কুলে আনা-নেওয়া করাটা বিরাট একটা ঝামেলার কাজ। আমরা কীভাবে কাজ বাদ দিয়ে ওদের আনা-নেওয়া করি? সরকারের পক্ষ থেকে শিশুদের শিক্ষার জন্য নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কথাটা তাদের অজানাই বলতে হবে।
প্রসঙ্গক্রমে তিনি আরও বলেন, আমরাও এক সময় মায়ের সঙ্গে এভাবে চা বাগানে আসতাম এবং তারপর এখানে শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করি। তার কথা থেকে এটা পরিষ্কার যে, মূলত দারিদ্র্য এবং অজ্ঞতার কারণেই চা শ্রমিকরা তাদের ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠাচ্ছে না।
শুধু চা বাগানে নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে চাতালে নারী শ্রমিকের সাথে তাদের শিশুরা অলস সময় পার করছে। অথচ স্কুল যাওয়ার বয়স হলেও তারা স্কুলে যাচ্ছে না।
শ্রীমঙ্গল থেকে ঢাকা ফেরার পথে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কাছে এসে গাড়ি বেশ কিছু সময়ের জন্য যাত্রাবিরতি করে। কাছেই একটি চাতালে গিয়ে কিছুক্ষণ অবস্থান করি। সেখানে দেখলাম, ছোট ছোট শিশুরা মায়েদের সঙ্গে কাজ করার চেষ্টা করছে। এরাও শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। সিলেট বা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যে চিত্র প্রত্যক্ষ করলাম, এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সারা বাংলাদেশেই নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী নারীদের সন্তানরা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সরকারের শিক্ষা কার্যক্রম সম্পর্কে এরা তেমন কোনো খবর রাখেন না। এ ছাড়া, মূলত দারিদ্র্য এবং অজ্ঞতার কারণে এরা বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাতে আগ্রহী হচ্ছে না।
এছাড়া তাদের মধ্যে এক ধরনের ধারণা প্রচলিত আছে যে, একটা ছেলে বা মেয়ে শিক্ষিত হলে তাকে দিয়ে সাধারণ কোনো কাজ করানো যাবে না। এ ছাড়া, শিক্ষার জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হবে। তার চেয়ে বরং ছোটোবেলায় তাদের কাজে লাগিয়ে দেওয়া হলে, তারা সংসারের জন্য বাড়তি আয় করতে পারবে। তারা এটা বুঝতে চান না যে, একটি ছেলে বা মেয়ে শিক্ষিত হলে পুরো পরিবারের চেহারাই পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে।
শিক্ষা হচ্ছে সবচেয়ে মূল্যবান বিনিয়োগ। কোনো জাতিই শিক্ষা ছাড়া কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধন করতে পারে না। বর্তমানে কর্মসংস্থানের জন্য অনেকেই ঘরের বাইরে আসছেন। কিন্তু তাদের অনেকেই এখনো শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করতে পারেন না। এভাবে আগামী প্রজন্মের একটি বিরাট অংশ শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এটা আমাদের জন্য যে কোনো বিচারেই অত্যন্ত উদ্বেগজনক। শিক্ষার আলো বঞ্চিত এসব শিশু আগামীতে নিরক্ষর নাগরিক হিসেবে বেড়ে ওঠবে।
বর্তমান সরকার সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করে চলেছে। কিন্তু সবার অলক্ষ্যে নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী নারীদের সন্তানরা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এটা চলতে থাকলে কোনোভাবেই সার্বজনীন শিক্ষা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তাই সমস্যাটি নিয়ে আমাদের জাতীয় পর্যায়ে ভাবতে হবে। বর্তমানে প্রায় এক কোটি নারী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রাতিষ্ঠানিক কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। এদের একটি বড় অংশ দরিদ্র পরিবার থেকে এসেছেন। শ্রমজীবী নারীদের এক বিরাট অংশই তৈরি পোশাক শিল্পে নিয়োজিত। এছাড়া অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমেও অনেকেই নিয়োজিত রয়েছেন। কিন্তু তাদের অধিকাংশেরই বাচ্চাদের স্কুলে পাঠানোর সামর্থ্য এবং ইচ্ছে নেই।
তারা বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাতে চান না এ কারণে যে, মনে করা হয় বাচ্চাদের স্কুলে পাঠিয়ে পরিবারের ব্যয় বাড়ানোর চেয়ে অল্প বয়সে তাদের কাজে লাগিয়ে দিতে পারলে বেশি লাভ হবে। প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা এসব বঞ্চিত শিশুদের শিক্ষামুখী করতে পারবে না।
এ জন্য বিকল্প চিন্তা-ভাবনা করা যেতে পারে। এই বিকল্প উদ্যোগটি আসতে পারে সংশ্লিষ্ট কর্ম দাতা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেই। যেসব প্রতিষ্ঠানে নারী শ্রমিক কাজ করেন, সেখানে বাধ্যতামূলকভাবে ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপনের ব্যবস্থা করতে হবে। অনেক কারখানা মালিকই হয়ত ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপনকে বাড়তি ব্যয় বলে মনে করেন। কিন্তু আসলে এটা কোনো বাড়তি ব্যয় নয়, বরং এক ধরনের বিনিয়োগ। কারণ যে নারী অনিরাপদ অবস্থায় তার শিশুকে বাড়িতে রেখে আসেন, তার পক্ষে কর্মক্ষেত্রে পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে কাজ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। অথচ তার বাচ্চাটিকে যদি কারখানার ডে-কেয়ার সেন্টারে রাখার ব্যবস্থা করা যায়, তবে তিনি পূর্ণ মনোযোগ সহকারে কাজ করতে পারবেন। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেরই সিএসআর ফান্ড থাকে। এই ফান্ড থেকে অর্থ ব্যয় করে ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয়ভাবেও আর্থিক সহায়তা প্রদান করা যেতে পারে।
দিনদিনই আমাদের দেশের নারীরা কর্মসংস্থানের জন্য বর্হিমুখী হচ্ছেন। কিন্তু তাদের সন্তানদের লেখাপড়ার বিষয়টি কোনোভাবেই নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এভাবে লোক চক্ষুর আড়ালে আগামী প্রজন্মের একটি অংশ অশিক্ষিত হয়ে বেড়ে উঠছে। অথচ প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজন অনুপাতে ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন করে শ্রমজীবী নারীদের সন্তানদের লালন-পালন এবং শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করা হলে আগামী প্রজন্ম শিক্ষিত এবং কর্মমুখী হয়ে গড়ে ওঠতে পারে।
এসব শিশুদের সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা দেওয়া হলে এরা দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। যেসব এলাকায় একাধিক শিল্পকারখানা আছে সেখানে যৌথ উদ্যোগে ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন করা যেতে পারে। প্রতিটি শিল্পকারখানা সেখানে সম-অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ব্যয় নির্বাহ করবে। এ জন্য প্রয়োজনে দেশের বেসরকারি সংস্থসমূহের সহায়তা গ্রহণ করা যেতে পারে।
আগামীতে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে আমরা বাংলাদেশকে মাঝারি আয়ের দেশে পরিণত করতে চাইলে পুরো জাতিকে শিক্ষিত করে গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে শ্রমজীবী মায়েদের সন্তান যদি শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত থাকে, তাহলে শতভাগ শিক্ষিত জাতির যে আকাঙ্ক্ষা আমরা হৃদয়ে ধারণ করছি, তা কোনোভাবেই অর্জিত হবে না। তাই বিষয়টি নিয়ে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ প্রজন্মের একটি অংশকে শিক্ষাবঞ্চিত রেখে কোনোভাবেই পরিপূর্ণ শিক্ষিত জাতি উপহার দেওয়া সম্ভব নয়। আগামীতে আমাদের দেশে শ্রমজীবী নারীর সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাবে। তাই বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে এখনই এ ব্যাপারে ইতিবাচক সিন্ধান্ত নিতে হবে।
মন্তব্য করুন