নিউজ ডেস্ক
৩ ঘন্টা আগে
অনলাইন সংস্করণ
পাঠক সংখ্যা ৪০ জন

এক মাসেও কাটেনি ডিমলার জ্বালানি সংকট, দীর্ঘ লাইনে জনভোগান্তি

(নীলফামারী) প্রতিনিধি:
নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় এক মাস পেরিয়ে গেলেও জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট কাটেনি। ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেল নিতে গ্রাহকদের দীর্ঘ লাইনের অপেক্ষা যেন শেষ হওয়ার নয়। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার কারণে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো পাম্পে ক্রেতা ও কর্মচারীদের মধ্যে বাগবিতণ্ডা, এমনকি সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, কোনো ফিলিং স্টেশনে তেল সরবরাহ হবে এমন খবর ছড়িয়ে পড়লেই আগের দিন বিকেল থেকেই মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনের দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়। তেল পাওয়ার আশায় অনেক চালক রাস্তায় কিংবা পাম্পের আশপাশে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন।

জানা গেছে, উপজেলার ঝুনাগাছ চাপানি ইউনিয়নের গ্রীন ফিলিং স্টেশন, খালিশা চাপানি ইউনিয়নের তিস্তা ফিলিং স্টেশন এবং সদর ইউনিয়নের আফতাব ও আলম ফিলিং স্টেশনে আগের তুলনায় জ্বালানি তেলের সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এতে স্বাভাবিক চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না।

বিকেল তিনটার দিকে জ্বালানি তেল সরবরাহের কথা থাকলেও আগের দিন রাত থেকেই মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে পড়েন। ফলে দীর্ঘ অপেক্ষা ও বিশৃঙ্খলায় চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।

দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা চালকরা ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবেই এই সংকট দীর্ঘায়িত হচ্ছে। এতে সময় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি দৈনন্দিন কাজকর্মও ব্যাহত হচ্ছে।

ডিমলা সদর ইউনিয়নের আলম ফিলিং স্টেশনের স্বত্বাধিকারী শাহ আলম জানান, চাহিদার তুলনায় তেলের সরবরাহ অত্যন্ত কম। স্বাভাবিক সময়ে এক সপ্তাহে যে পরিমাণ তেল বিক্রি হতো, বর্তমানে অতিরিক্ত চাহিদার কারণে তা এক বেলাতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে অনেক গ্রাহক দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও তেল না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন, যা থেকে অসন্তোষ ও সংঘর্ষের সৃষ্টি হচ্ছে।

এদিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও কাঙ্ক্ষিত তেল না পাওয়ায় সেচ কার্যক্রমসহ বিভিন্ন দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে বোরো মৌসুমে সেচনির্ভর কৃষিতে এর প্রভাব মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।

জ্বালানি সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে কৃষি খাতেও। স্থানীয় কৃষক আব্দুল করিম জানান, জ্বালানি তেল না পাওয়ায় সময়মতো জমিতে সেচ দিতে পারছেন না। তিনি বলেন, “জমিতে পানি দিতে না পারলে ফসল নষ্ট হয়ে যাবে। তেলের জন্য পাম্পে ঘুরে বেড়াচ্ছি, কিন্তু ঠিকমতো পাচ্ছি না।” তিনি আরও বলেন, সেচযন্ত্র চালাতে না পারায় বোরো ধানসহ অন্যান্য ফসল হুমকির মুখে পড়েছে। অনেক কৃষক বিকল্প হিসেবে কম সেচের ফসলের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হচ্ছেন।

স্থানীয় একটি এনজিওর কর্মী আহসান হাবিব বলেন, “তেলের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে দিনের বেশিরভাগ সময় নষ্ট হচ্ছে। সময়মতো অফিসে পৌঁছাতে পারছি না, এতে চাপ তৈরি হচ্ছে।” তিনি জানান, অফিস শেষে পাম্পে এসে লাইনে দাঁড়াতে গিয়ে পুরো দিনই শেষ হয়ে যাচ্ছে, ফলে ব্যক্তিগত জীবনেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

জ্বালানি সংকটে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন ঔষধ কোম্পানির ডেলিভারি কর্মীরা। সারারাত লাইনে দাঁড়িয়েও অনেক সময় তেল পাওয়া যাচ্ছে না। এতে তাদের দৈনন্দিন আয় মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধি নজরুল ইসলাম বলেন, “সারারাত জেগেও তেল পাইনি। আজ কাজ করতে পারব কি না জানি না।” তিনি জানান, তেলের অভাবে তার আয়ের পথ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

প্রতিদিনের আয়ের ওপর নির্ভরশীল এসব কর্মীরা জানান, এভাবে চলতে থাকলে তাদের জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে।

পাম্পের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা আয়নাল হক আক্ষেপ করে বলেন, “বাচ্চা বাসায়, স্কুলে যাওয়া বন্ধ। কী করব, তেলের দরকার আগে।” তার এই বক্তব্য বর্তমান পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও নির্দিষ্ট সময়সূচি নিশ্চিত করা গেলে এই ভোগান্তি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে তারা ফুয়েল কার্ডের মাধ্যমে জ্বালানি তেল সরবরাহ চালুর দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, এ ব্যবস্থা চালু হলে অপ্রয়োজনীয় ভিড় কমবে এবং প্রকৃত প্রয়োজনীয় ব্যক্তিরাই তেল সংগ্রহ করতে পারবেন।

অভিযোগ রয়েছে, অনেকেই পাম্প থেকে তেল কিনে বাইরে বেশি দামে বিক্রি করছেন, যা কৃত্রিম সংকটকে আরও তীব্র করছে। এসব অনিয়ম বন্ধে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি জরুরি বলে মনে করছেন তারা।

স্থানীয়দের মতে, দেশের বিভিন্ন স্থানে ইতোমধ্যে ফুয়েল কার্ড পদ্ধতি চালু করে জ্বালানি তেল বিতরণে শৃঙ্খলা আনা সম্ভব হয়েছে। ডিমলাতেও একই ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। তাদের দাবি, এ পদ্ধতি চালু হলে তেল সরবরাহে স্বচ্ছতা আসবে, ভোগান্তি কমবে এবং অনিয়ম অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আসবে।

এ বিষয়ে ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরানুজ্জামান বলেন, “জ্বালানি তেলের সরবরাহ ঘাটতির বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কোনো ধরনের অব্যবস্থাপনা বা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ টিম কাজ করছে। খুব দ্রুত সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে আশা করছি।”

তিনি আরও জানান, খুব শিগগিরই উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ডিমলার সকল রেজিস্ট্রেশনকৃত মোটরসাইকেল এবং বৈধ লাইসেন্সধারী চালকদের জন্য ‘ফুয়েল কার্ড’ ব্যবস্থা চালু করা হবে। এতে জ্বালানি তেল বিতরণে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে।

জ্বালানি তেলের ওপর মানুষের নির্ভরশীলতা কতটা বেশি, তা এই সংকটেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অনেকেই পারিবারিক প্রয়োজনের চেয়েও তেল সংগ্রহকে অগ্রাধিকার দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

চরম ভোগান্তিতে থাকা সাধারণ মানুষ এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছেন।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

কোলোরেক্টাল ক্যান্সার প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি ও নিয়মিত স্ক্রিনিং জরুরি: চসিক মেয়র

নাসিককে মাদকমুক্ত আধুনিক নগরীতে রূপান্তর করা হবে : সাখাওয়াত হোসেন খান

খাগড়াছড়িতে আগুনে পুড়ে ছাই ৯ দোকান

রাজধানীতে ৭০০ পিস ইয়াবাসহ ২ মাদক কারবারি গ্রেফতার

আল-আকসায় লাখো মুসল্লির জুমার নামাজ আদায়

হাতিয়ায় ৬ হাজার ৮১৫ লিটার অবৈধ জ্বালানি তেলসহ আটক ৪

মনোহরগঞ্জে শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান স্মৃতি ফুটবল টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত

ডিমলায় টাকায় অভাবে কিডনি রোগী অনিল চন্দ্রের চিকিৎসা বন্ধ

ভারত থেকে এলো আরো ৮ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল

প্রধানমন্ত্রী ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন আগামী ১৪ এপ্রিল

১০

নওগাঁয় ৭ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের উদ্বোধন করলেন সদর- ৫ আসনের এমপি জাহিদুল ইসলাম ধলু।

১১

এক মাসেও কাটেনি ডিমলার জ্বালানি সংকট, দীর্ঘ লাইনে জনভোগান্তি

১২

আশুলিয়ায় জাল নোটসহ ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি পুলিশ

১৩

যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধে ইসলামাবাদে মার্কিন-ইরান বৈঠক

১৪

কৃষকদের সেচ সংকট নিরসনে এমপি বুলবুলের সরজমিন পরিদর্শন

১৫

নিউজিল্যান্ড সিরিজকে সামনে রেখে দল ঘোষণা করেছে বিসিবি

১৬

ইস্টার যুদ্ধবিরতির আগে রুশ হামলায় ইউক্রেনে নিহত ২

১৭

ইরান আলোচনায় যোগ দিতে পাকিস্তান পৌঁছেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স

১৮

কুড়িগ্রাম সোনালী ব্যাংক ম্যানেজার শরীফ হাসানের বিরুদ্ধে দূর্নীতির অভিযোগ

১৯

২০