পেঁয়াজের কেজি ১০০ টাকা: কী করছে বাংলাদেশের ব্যবসায়ী ও সরকার?

ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয়ার পর বাংলাদেশে একদিনেই পেঁয়াজের দাম এক তৃতীয়াংশ বেড়ে গেছে।

সোমবার ঢাকার খুচরা বাজারে প্রতি কেজি পেঁয়াজ ৬০ টাকা দরে বিক্রি হলেও মঙ্গলবার বিক্রি হয়েছে ৯০ থেকে ১০০ টাকা দরে।

দিল্লিতে বিবিসির সংবাদদাতারা বলছেন, ভারী বর্ষণে পেঁয়াজের চাষাবাদ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্য বৃদ্ধি আর রাজনৈতিক বিবেচনায় ভারত এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তবে বাংলাদেশের ক্রেতারা ভয় পাচ্ছেন, পরিস্থিতি সামাল দেয়া না গেলে গত বছরের মতো এবারও পেঁয়াজের দাম আকাশচুম্বী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

গত বছর এই সেপ্টেম্বর মাসেই ভারত পেঁয়াজ রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা দেয়ার পর বাংলাদেশে পেঁয়াজের দাম ৩০০ টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি পেঁয়াজ রপ্তানি করে ভারত।

এখন ব্যবসায়ীরা দাম বাড়াচ্ছেন
বাংলাদেশের পেঁয়াজ আমদানি কারক এবং পাইকারি বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যাচ্ছে, বর্তমানে দেশে দেশি-বিদেশি যে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে, তা দেশেই উৎপাদিত অথবা আগের স্বল্প মূল্যে কেনা পেঁয়াজ।

কিন্তু ভারত থেকে আমদানী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নিজেদের হাতে থাকা পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন বিক্রেতারা।

ঢাকার কলাবাগানের ক্রেতা সোহানা ইয়াসমিন বলছেন, দুইদিন আগে যে পেঁয়াজ কিনেছি ৬০ টাকায়, আজ কীভাবে সেটা ১০০ টাকা হয়? ভারত রপ্তানি বন্ধ করেছে বুঝলাম, কিন্তু এই পেঁয়াজ তো আগেই কেনা। তাহলে এটার দাম বাড়ল কীভাবে?

দোকানদার আল-আমিন অবশ্য দাবি করছেন, পাইকারি বাজার থেকে তাকে চড়া দামে কিনতে হয়েছে। এ কারণে তিনিও বেশি দামে বিক্রি করছেন।

সরকারি হিসাবে, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ২৩ লাখ মেট্রিকটন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়। তবে নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর প্রায় ১৯ লাখ মেট্রিকটন পেঁয়াজ থাকে। অথচ চাহিদা রয়েছে ৩০ লাখ মেট্রিকটন পেঁয়াজের। বাকি ১১ লাখ মেট্রিকটন পেঁয়াজ আমদানি করা হয়, যার বেশিরভাগই আসে ভারত থেকে।

ঢাকার শ্যামবাজারের একজন পাইকারি বিক্রেতা জি এস মানিক বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ”এখন যারা বেশি দামে পেঁয়াজ বিক্রি করছেন, এগুলো আসলে তাদের আগের কেনা। বাড়তি লাভ করার জন্য তারা দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন।”

”তবে বাংলাদেশের পেঁয়াজ আমদানির বেশিরভাগই হয় ভারত থেকে। সেখান থেকে আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই পেঁয়াজের দাম বাড়বে। কারণ মিয়ানমার, পাকিস্তান, তুরস্ক বা মিশর থেকে পেঁয়াজ আনতে হলেও তাতে সময় লাগবে।”

জি এস মানিক অবশ্য মনে করেন না, গত বছরের মতো আকাশচুম্বী দামের দিকে পেঁয়াজ যাবে।

”এই বছর আমাদের একটা প্রস্তুতি আছে। গত বছরের পেঁয়াজ আমদানির অভিজ্ঞতাও আছে। এছাড়া দেশে যে মজুত আছে, তাতে আরও অন্তত দুইমাস চলবে। আমার মনে হয় না যে এইবার পেঁয়াজের দাম গত বছরের মতো হবে।” বলছেন মি. মানিক।

অযৌক্তিকভাবে বাড়তি দামে পেঁয়াজ বিক্রি করার কারণে পাইকারি বাজার শ্যামবাজারে মঙ্গলবার অভিযান চালিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। বেশ কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে এই সময় জরিমানাও করা হয়েছে।

হঠাৎ করে ভারতের এই নিষেধাজ্ঞা
বাংলাদেশের আমদানিকারকরা বলছেন, ভারত যে পেঁয়াজ রপ্তানিকে নিষেধাজ্ঞা দেবে, সেটা তারা আগে থেকে কোন ধারণা করতে পারেননি।

শ্যামবাজারের পবিত্র ভাণ্ডার নামের একটি আমদানি কারক প্রতিষ্ঠানের প্রধান হাজী হাফিজ মিয়া বলছেন, ”আচমকা তারা এই নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। কয়েকদিন ভারতের বাজারে দাম বাড়ছিল। কিন্তু তারা যে রপ্তানি বন্ধ করে দেবে, এমন কোন আভাস পাইনি।”

বাংলাদেশের অনেক ব্যবসায়ীর পেঁয়াজ এখন ভারতের অভ্যন্তরে গাড়িতে আটকা পড়ে রয়েছে বলে তিনি জানান। অনেকে লেটার অব ক্রেডিট বা এলসি খুলেছেন, কিন্তু আনতে পারেননি।

ভারত কবে তাদের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে তার কোন সময়সীমা জানায়নি।

কেন ভারতের এই নিষেধাজ্ঞা?
পেঁয়াজ রপ্তানির নিষেধাজ্ঞায় ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কোন কারণ উল্লেখ করেনি। তবে বিবিসির সংবাদদাতা শুভজ্যোতি ঘোষ বলছেন, ভারতের বাজারে গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই পেঁয়াজের দামে যে অস্থিরতা চলছিল, তারই জের ধরে এই নিষেধাজ্ঞা।

তিনি বলছেন, ভারতের রাজনীতিতে পেঁয়াজের দাম বড় একটি ইস্যু। এর জের ধরে অতীতে সরকার পতনের মতো ঘটনাও ঘটেছে। ফলে ভারতের সরকার কোনভাবেই চায় না যে, পেঁয়াজের দাম অনেক বেড়ে যাক। এ কারণেই গত বছর পেঁয়াজের দাম বাড়তে শুরু করলে সরকার নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল, এই বছরেও তাই।

”বিশেষ করে গত বছর যখন পেঁয়াজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছিল, তার কিছুদিন পরেই মহারাষ্ট্র্রের নির্বাচন ছিল। এবার কিছুদিন পরেই বিহারের নির্বাচন রয়েছে। ফলে এই সময়ে পেঁয়াজের দাম নিয়ে কোন অসন্তোষ তৈরি হোক, সেটা সরকার চায় না। সবমিলিয়ে পেঁয়াজ রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা দেয়ার ক্ষেত্রে এসব রাজনৈতিক হিসাব নিকাশ কাজ করেছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।”

গত একমাসে ভারতের মহারাষ্ট্রে পেঁয়াজের পাইকারি দাম তিনগুণ হয়ে গেছে। বিশেষ করে ভারী বর্ষণে কর্ণাটক এবং অন্ধ্রপ্রদেশে পেঁয়াজের চাষাবাদ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বিদেশের বাজারেও দাম বেড়েছে
আমদানিকারকরা বলছেন, ভারত রপ্তানি বন্ধ করে দেয়ার প্রভাব পড়েছে পেঁয়াজের আন্তর্জাতিক বাজারেও। একদিনের ব্যবধানেই আন্তর্জাতিক বাজারে পেঁয়াজের দাম টন প্রতি ৫০ থেকে ১০০ ডলার বেড়ে গেছে।

শ্যামবাজারের আমদানি কারক হাজী হাফিজ মিয়া বলছেন, ”ভারত রপ্তানি বন্ধ করে দেয়ার পর আমরা মিয়ানমার, তুরস্ক, মিশর, পাকিস্তানে যোগাযোগ করছি। কিন্তু সেখানেও গতকালের চেয়ে আজ দাম বেড়ে গেছে। ভারতের বাজার বন্ধ, তাই এসব দেশের পেঁয়াজ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সবাই যোগাযোগ করছে। তারাও দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।”

তবে এসব দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির বড় সমস্যা হলো, জাহাজে করে এসব পেঁয়াজ দেশে আনতে ২০ দিন থেকে শুরু করে একমাস সময় লাগে। এমনকি সীমান্ত বন্ধ থাকায় বাংলাদেশের আরেক প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের পেয়াজ আনতে হলেও সিঙ্গাপুরে ঘুরে আনতে হবে, যে কারণে তাতেও তিন সপ্তাহের মতো সময় লাগতে পারে।

অনেক আমদানি কারক, মিয়ানমার, পাকিস্তান, মিশর এবং তুরস্কের সঙ্গে যোগাযোগ করে এর মধ্যেই এলসি খুলতে শুরু করেছেন। আবার কোন কোন আমদানিকারকদের আশঙ্কা, তারা এসব দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির এলসি খোলার পর, এই একমাসের মধ্যে যদি ভারত তাদের বাজার আবার খুলে দেয়, তাহলে তাদের অনেক লোকসান হবে। কারণ বাংলাদেশের বাজারে দেশি পেয়াজের পরই ভারতীয়, মিয়ানমার বা পাকিস্তানের পেঁয়াজের চাহিদা বেশি।

শ্যামবাজারের ব্যবসায়ী রফিক হাজী বলছেন, ”আমি এখন মিসর বা তুরস্ক থেকে পেঁয়াজ আমদানি করতে গেলাম। তিন সপ্তাহ পর ভারত আবার বাজার খুলে দিল। তখন তো আমি এসব পেঁয়াজ বেচতে পারবো না। তাই অনেক ব্যবসায়ী অন্য দেশ থেকে এলসি খোলার সাহসও পাচ্ছেন না।”

তিনি পরামর্শ দেন, সরকার যদি এই নিশ্চয়তা দেয় যে, তখন তারা পেঁয়াজ কিনে নেবে বা রপ্তানি চালু করা হলেও বাংলাদেশের তরফ থেকে ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানিকে বিধিনিষেধ দেয়া হবে, তাহলে তারা ঝুঁকি নিতে পারেন।

সংকট সামাল দিতে কী পরিকল্পনা সরকারের?
গত বছর সেপ্টেম্বরের ২৯ তারিখে ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয়ার পর বেসরকারি আমদানিকারকদের পাশাপাশি নিজেরাও পেঁয়াজ আমদানি করে সামাল দেয়ার চেষ্টা করেছিল সরকার। কিন্তু তারপরেও ৩০ টাকা থেকে পেঁয়াজের দাম ৩০০ টাকায় উঠে যাওয়া বন্ধ করা যায়নি।

এবার সরকার সেই পরিস্থিতি এড়াতে কি পরিকল্পনা করছেন?

সরকারিভাবে কম দামে খোলা বাজারে পেঁয়াজ বিক্রি করে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করছে সরকার। পাশাপাশি ভারত ছাড়াও বিকল্প বাজারের খোঁজ নিতে শুরু করেছে।

বাংলাদেশ সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ”আমরা বিকল্প বাজার থেকে পেঁয়াজ আমদানি করার চেষ্টা করবো। গত বছর থেকে আমাদের তো কিছু অভিজ্ঞতা হয়েছে। মায়ানমার, টার্কি, ইজিপ্ট, চায়না থেকে। বাইরে থেকে আমদানি করা সম্ভব হলে পরিস্থিতি ভালো হবো ”

”তবে গত বছরের মতো পরিস্থিতি এবার হবে না। কারণ দেশে তো পর্যাপ্ত পেঁয়াজ রয়েছে। হয়তো ৩০/৪০ টাকা হবে না, কিন্তু গত বছরের মতো অতো দামেও বিক্রি হবে না। আমরা বিভিন্ন বাজারে খোঁজ নিচ্ছি। আশা করছি, অন্যান্য জায়গা থেকে পেঁয়াজ এনে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবো।” তিনি বলছেন।

সরকারি বিক্রয় প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবির) মুখপাত্র মোঃ হুমায়ুন কবির বলছেন, আমরা বেশ কিছুদিন ধরেই ২৮৫টি পয়েন্টে কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করছি। সেই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি অন্যান্য দেশ থেকেও পেঁয়াজ আমদানির যে নিয়মিত প্রক্রিয়া, সেটাও অব্যাহত রয়েছে। সূত্র : বিবিসি বাংলা।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *